বাবার নিঃশব্দ আকাশ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষনধর্মী।১২ নভেম্বর ২০২৫
আমার বাবাকে আমি কখনো “ভালোবাসি” বলতে শুনিনি।
একবারও না।
ছোটবেলায় স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকতেন, পকেটে দুটো টাকা রেখে বলতেন, “দোকান থেকে বিস্কুট কিনে খাস।” আমি দৌড়ে চলে যেতাম, পেছনে তাকাতাম না। তিনি আর কিছু বলতেন না। শুধু দূর থেকে হাত নেড়ে জানাতেন, “যাচ্ছি।”
বাবা কথা কম বলতেন। রাগ হলে চুপ করে থাকতেন। আমরা ভয়ে কাঁপতাম, কিন্তু পরমুহূর্তেই দেখতাম তিনি রান্নাঘরে গিয়ে চুপচাপ চা বানাচ্ছেন। আমাদের জন্য। আমরা বুঝতাম, রাগটা আমাদের ওপর নয়, নিজের অসহায়ত্বের ওপর।
একবার আমি এসএসসি দিয়ে ফেল করেছিলাম। বাড়ি ফিরে দেখি বাবা বারান্দায় বসে আছেন।
আমি মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুধু বললেন, “চা খাবি?”
সেইদিনই রাতে তিনি আমার কোচিংয়ের টাকা জোগাড় করতে নিজের সাইকেলটা বেচে দিয়েছিলেন। আমি জানতাম না। অনেক পরে মা বলেছিলেন।
বাবার হাতে সবসময় একটা ছোট্ট কালো ব্যাগ থাকত। সকালে বেরোনোর আগে তাতে ভাত-তরকারি ভরে নিতেন। মা যখন বলতেন, “এত কষ্ট করো কেন?”
তিনি হাসতেন, “আমার তো পেট ভরে গেছে।” আমরা জানতাম, তিনি মিথ্যে বলছেন। কারণ রাতে ফিরে এসে আবার ভাত খেতেন, একটু বেশি।
গত বছর বাবার হার্টে ব্লক ধরা পড়ল। ডাক্তার বললেন, “অপারেশন না করলে আর বেশিদিন নেই।” টাকা ছিল না। আমি চাকরির প্রথম মাসের বেতন পুরোটা তুলে দিলাম। বাবা দেখে চুপ করে রইলেন। তারপর রাতে আমার ঘরে এসে বললেন, “তোর বেতন রাখ। আমি ঠিক হয়ে যাব।”
পরদিন সকালে দেখি তিনি ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে গেছেন। হাসপাতালের টাকা জোগাড় করতে গিয়েছিলেন কারখানায় ওভারটাইম করতে।
আজ বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন। কথা বলতে পারেন না। আমি তাঁর পাশে বসে আছি। হাতটা ধরেছি। হাতটা এখনো গরম। আমি বললাম, “বাবা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।”
তিনি চোখ বন্ধ করে রইলেন। তারপর আস্তে আস্তে আমার হাতটা চেপে ধরলেন। শক্ত করে।
একটাও কথা বললেন না।
কিন্তু আমি বুঝলাম, এই চাপটাই তাঁর “ভালোবাসি”।
বাবা, তুমি কখনো আকাশ হওনি।
তুমি ছিলে আমাদের মাটি।
যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আকাশ দেখতে শিখেছি।
#বাবা #আমারবাবা #ভালোবাসারনামবাবা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।