নিজের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
জীবন ও জীবনবোধ | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদিন আমরা কারও না কারও সঙ্গে কথা বলি।
শুধু নিজের সঙ্গে বসার সময়টা নেই।
সকালে ঘুম ভাঙার পর হাতটা অজান্তেই মোবাইলের দিকে চলে যায়। কে কী লিখল, কে কোথায় গেল, কার ছবি উঠল—দেখতে দেখতে সকাল হয়ে যায়।
তারপর কাজ।
ফোন।
মেসেজ।
মানুষ।
সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরেও নীরবতা সহ্য হয় না।
টেলিভিশন চলে।
কোনো ভিডিও চলে।
মোবাইলে গান বাজে।
কেউ না থাকলে নিজের মনটাকেও ব্যস্ত রাখার একটা ব্যবস্থা আমরা করে ফেলেছি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মানুষ এখন একা থাকতে ভয় পায় না।
সে নিজের সঙ্গে একা থাকতে ভয় পায়।
বাসে বসে আছি—মোবাইল।
কারও জন্য অপেক্ষা করছি—মোবাইল।
লিফটে উঠেছি—মোবাইল।
ঘুম আসছে না—মোবাইল।
দুই মিনিট চুপচাপ বসে থাকলেই মনে হয়, কিছু একটা করা দরকার।
কিন্তু সেই “কিছু একটা” না করে যদি একদিন চুপ করে বসি?
তখন হয়তো ভেতর থেকে এমন কিছু কথা উঠে আসবে, যেগুলো এতদিন শুনতে চাইনি।
হয়তো মনে পড়বে সেই মানুষটার কথা, যার সঙ্গে অন্যায় করেছি।
হয়তো মনে হবে, যে চাকরিটাকে এতদিন জীবন বলে ধরে রেখেছি, সেটা আসলে আমার জীবন নয়।
হয়তো বাবাকে শেষবার ফোন করার কথা মনে পড়বে।
ফোন করা হয়নি।
হয়তো একই ঘরে থাকা সন্তানের দিকে তাকিয়ে মনে হবে—কতদিন তার সঙ্গে মন দিয়ে কথা বলা হয়নি।
কিছু অনুশোচনা আছে, ব্যস্ত থাকলে চুপ করে থাকে।
নীরব হলেই কথা বলে।
তাই হয়তো আমরা নীরবতাকে ভয় পাই।
নীরবতা কোনো শব্দ করে না।
তবু তার মধ্যে এমন কিছু শব্দ থাকে, যেগুলো অন্য কোনো শব্দ দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না।
ছোটবেলায় বিকেলগুলো কত দীর্ঘ ছিল।
একটা ছাদ।
একটা মাঠ।
একটা জানালা।
কখনো একটা পুরোনো বই।
কিছু না করেও কতক্ষণ কেটে যেত।
তখন বিরক্ত লাগত।
মনে হতো, সময় যাচ্ছে না।
এখন সময় যায় খুব দ্রুত।
সকাল আসে।
দুপুর চলে যায়।
সন্ধ্যা নামে।
রাত হয়ে যায়।
তারপর একদিন হঠাৎ মনে হয়—
এতদিন কোথায় ছিলাম?
দিনের শেষে বিছানায় শুয়ে আমরা বলি, আজ সারাদিন কত কিছু করলাম।
কিন্তু নিজের কাছে যদি প্রশ্ন করি—
আজ নিজের জন্য কী করলাম?
উত্তরটা সবসময় আসে না।
কারণ নিজের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাসটাই হয়তো ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছি।
নিজের সঙ্গে কথা বলা মানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে কথা বলা নয়।
বরং দিনের কোনো এক সময় নিজের ভেতরে একটু ফিরে যাওয়া।
আজ কেন মন খারাপ হলো?
কোন কথাটা আমাকে এত কষ্ট দিল?
আমি কি সত্যিই এই জীবনটা চাই?
যে মানুষটার ওপর এতদিন রাগ করে আছি, তার সঙ্গে কথা না বলে আমি কি সত্যিই ভালো আছি?
যে স্বপ্নটা বহু বছর আগে ছেড়ে দিয়েছি, সেটা কি সত্যিই আমার ছিল না—নাকি আমি শুধু ভয় পেয়েছিলাম?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।
কিছু উত্তর পেতে সময় লাগে।
কিছু উত্তর হয়তো কোনোদিনও পাওয়া যায় না।
তবু প্রশ্নগুলো নিজের কাছে রাখা দরকার।
কারণ মানুষ যখন নিজের কাছে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়, তখন অন্যেরা ধীরে ধীরে তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে।
কী চাইব।
কী কিনব।
কোথায় যাব।
কেমন দেখতে হলে আমাকে ভালো বলা হবে।
কাকে সফল বলা হবে।
কী করলে মানুষ আমাকে পছন্দ করবে।
একসময় বাইরে থেকে আসা এই শব্দগুলো এত বেশি হয়ে যায় যে নিজের কণ্ঠটাই আর শোনা যায় না।
তারপর একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়—
জীবনটা তো আমারই ছিল।
তাহলে এতদিন আমি কার জীবন বেঁচেছি?
সবসময় বিনোদন পাওয়া মানে ভালো থাকা নয়।
সবসময় মানুষের মধ্যে থাকা মানে একাকিত্ব না থাকা নয়।
আর সবসময় ব্যস্ত থাকা মানে জীবনে কোনো সমস্যা নেই—এটাও নয়।
কখনো কখনো মানুষ শুধু নিজের ভেতরের একটা দরজা বন্ধ রেখে ব্যস্ত থাকে।
দরজাটা খুলতে খুব বেশি কিছু লাগে না।
একটা সন্ধ্যা।
একটা খালি চেয়ার।
ফোনটা একটু দূরে রেখে দেওয়া।
কোনো গান নয়।
কোনো পর্দা নয়।
কারও সঙ্গে কথা নয়।
শুধু কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকা।
প্রথম দশ মিনিট অস্বস্তি হবে।
মনে হবে, সময় থেমে আছে।
তারপর হয়তো খুব আস্তে একটা কণ্ঠস্বর শোনা যাবে।
অনেকদিনের চেনা।
কিন্তু অনেকদিন শোনা হয়নি।
সে হয়তো অভিযোগ করবে।
হয়তো পুরোনো কোনো কথা মনে করিয়ে দেবে।
হয়তো এমন কোনো স্বপ্নের কথা বলবে, যেটাকে আমরা নিজেরাই অনেক আগে মেরে ফেলেছি।
হয়তো কোনো মানুষের কথা বলবে, যাকে আমরা ভুলে গেছি বলে নিজেকে বোঝাই।
তাকে থামানোর দরকার নেই।
সব কথার উত্তরও দিতে হবে না।
শুধু শুনতে হবে।
কারণ পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখার আগে, মাঝে মাঝে নিজের সঙ্গে সম্পর্কটাও ঠিক করা দরকার।
হয়তো আজ রাতে ঘুমানোর আগে ফোনটা একটু দূরে রাখা যায়।
ঘরটা অন্ধকার করা যায়।
কোনো শব্দ না চালিয়ে কয়েক মিনিট চুপ করে থাকা যায়।
কোনো উত্তর খুঁজতে হবে না।
শুধু নিজের কাছে একটা প্রশ্ন রেখে দেওয়া যায়—
“আমি সত্যিই ভালো আছি তো?”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।