সময়ের পালাবদল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৫ মে, ২০২৬
এক সময় যে পোস্ট অফিসে মানি অর্ডারের চিঠির জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত, আজ সেখানে ধুলো জমে থাকে। জানালার কাঁচে আলো পড়ে, কিন্তু ভেতরে আর সেই ভিড় নেই। প্রযুক্তি বদলেছে, যোগাযোগ বদলেছে—আর বদলে গেছে মানুষের অপেক্ষা। এখন আর কেউ চিঠির জন্য জানালায় তাকায় না।
যে ছেলে ১৩ টাকার সিগারেট কিনে বন্ধুদের সামনে নিজেকে “বড়” ভাবত, আজ সেই একই মানুষ জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে দোয়া চায়। যে বয়সে সে অহংকারকে শক্তি মনে করেছিল, সেই একই বয়সে সে বুঝতে শিখেছে—শরীরের ভেতরের ভাঙনকে কোনো দম্ভ ঢেকে রাখতে পারে না।
যে মানুষ ৫ কেজি চালের লাইনে রোদে পুড়ে দাঁড়িয়ে থাকত, একসময় তার দরজার সামনেই এখন অন্যরা দাঁড়িয়ে থাকে এক মুঠো খাবারের আশায়। জীবন শুধু অবস্থান বদলায় না, ভূমিকা বদলে দেয়—কখনো ভুক্তভোগী, কখনো সাক্ষী, কখনো আবার নির্ভরতার কেন্দ্র।
যে বাড়িওয়ালা মাসের পাঁচ তারিখ পার হলেই ভাড়াটেকে হুমকি দিতেন, আজ তিনি নিজেরই আশ্রয়ের জায়গা খুঁজে বেড়ান। যে ক্ষমতা একসময় অন্যকে ছোট করেছিল, সময় সেই ক্ষমতাকেই ধীরে ধীরে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কোনো শব্দ ছাড়াই সে হিসাব মেলাতে শুরু করে।
যে শিক্ষক ক্লাসে সবচেয়ে দুর্বল ছেলেটাকে অপমান করতেন, সময় তাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে—আজ সেই ছাত্রই তার সন্তানের দায়িত্ব নিচ্ছে মানুষ হওয়ার পথে। এই ঘটনাটা কোনো প্রতিশোধ না, এটা সময়ের অদৃশ্য ভারসাম্য। যেখানে ভূমিকা বদলায়, কিন্তু শিক্ষা থেকে যায়।
এক সময়কার নামকরা বিউটি সোপ কসকো আজ টয়লেটে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্র্যান্ডের উজ্জ্বলতা থাকে না, থাকে শুধু স্মৃতি। বাজারে জিনিস টিকে থাকে না শুধু মানে, টিকে থাকে সময়ের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতায়।
পূর্বপুরুষ থেকে প্রজন্ম ধরে যারা অন্যের ঘরে কাজ করে পেটের জ্বালা মিটাত, তাদের সন্তানরা আজ অনেক জায়গায় নিজের অবস্থান তৈরি করছে। আর সেই পরিবর্তনের ভেতরে কোথাও কোথাও উল্টে যাচ্ছে পুরনো সামাজিক সমীকরণও। সময় এখানে কাউকে চিরস্থায়ী মালিক বানায় না, আবার কাউকে চিরস্থায়ী ভাড়াটেও রাখে না।
এই পরিবর্তনের ভেতরে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো—সময় কোনো ঘোষণা দেয় না। সে বলে না, “আমি আসছি।” সে শুধু চলে আসে। আর যখন আসে, তখন অনেক কিছুই আর আগের মতো থাকে না।
সময় খুবই নির্মম, আবার খুবই নীরব। কখনো মনে হয় সে সবকিছু ভেঙে দিচ্ছে, আবার কখনো মনে হয় সে নতুন করে সাজিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আসলে সে শুধু বদল ঘটায়—ভালো বা খারাপের লেবেল ছাড়া।
এই কারণেই সময়কে নিয়ে অহংকার করা যায় না, আবার তাকে ভয়ও পাওয়ার দরকার নেই। কারণ সময় কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সে কারও পক্ষ নেয় না, আবার কারও বিপক্ষেও না। সে শুধু চলতে থাকে, আর সেই চলার ভেতরেই মানুষের আসল পরিচয় প্রকাশ পায়।
জীবনে যা আজ পাথর, কাল তা বালি। যা আজ বালি, কাল তা আবার পাথর হয়ে ফিরে আসতে পারে। এই ভাঙা-গড়ার ভেতরেই মানুষ সম্পর্ক বানায়, স্বপ্ন দেখে, আবার সব হারিয়ে নতুন করে শুরু করে।
তাই কোনো অবস্থানই চিরস্থায়ী নয়—না অহংকার, না দুঃখ। কারণ সময় কাউকে চিরস্থায়ী লিজ দেয় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।