আইন আমার অধিকার ভিক্ষা না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৩ মে, ২০২৬
আইন ভিক্ষা না। এটা আমার অধিকার।
আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে যখন কেউ হাত কচলায়, তখন ভুলটা শুরু হয় সেখান থেকেই—আমরা ন্যায়বিচারকে অনুগ্রহ ভাবতে শিখেছি। অথচ আইনের কোনো ধারায় লেখা নেই যে ন্যায় দয়া করে দেওয়া হবে।
আইনের আসল কাজ ভিক্ষা দেওয়া নয়, বরং যা মানুষের প্রাপ্য, সেটাকে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু বাস্তব জীবনে অনেক সময় মানুষ আদালত বা প্রশাসনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অনুরোধকারীর অবস্থানে ফেলে দেয়। যেন ন্যায়বিচার পাওয়া মানে কারও মন গলানো।
এই ভুল বোঝাবুঝির জায়গাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
প্রথম সমস্যা হলো ভয়। মানুষ আইনকে অধিকার আদায়ের জায়গা হিসেবে না দেখে শেষ আশ্রয় হিসেবে দেখে। ফলে তারা “দাবিদার” না হয়ে “অনুরোধকারী” হয়ে যায়।
একটি সাধারণ দৃশ্য ধরুন—থানায় গিয়ে কেউ অভিযোগ দিতে গেলে তাকে বলা হয়, “উপর থেকে ফোন আসেনি” বা “এখন লিখে রাখলাম, পরে দেখবো।” তখন অভিযোগকারীও ভাবে, “ঝামেলা না করে চলে যাই।” এখান থেকেই মানসিক পরাজয় শুরু হয়।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো প্রবেশাধিকারের জটিলতা। আইন আছে, কিন্তু সেটাকে ব্যবহার করার পথ সবার জন্য সমান নয়। কাগজপত্র, সময়, খরচ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য বিচারব্যবস্থা অনেক সময় দূরের জগৎ হয়ে যায়।
আইন বলছে শ্রমিকের ওভারটাইম পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু বাস্তবে গার্মেন্টসে কাজ করা একজন কর্মী সেই টাকা চাইতে গেলে চাকরি হারানোর ভয় পায়। এখানে সমস্যা অধিকার নেই—সমস্যা সেটাকে প্রয়োগ করার শক্তি।
এই দুই সমস্যার মূল কথা একটাই—অধিকার লেখা আছে, কিন্তু সেটার কাছে পৌঁছানোর পথ সমান নয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই জায়গা থেকে বের হওয়ার পথ কী?
প্রথমত, আইনকে দূরের বিষয় ভাবা বন্ধ করতে হবে। আইন শুধু আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এটা প্রতিদিনের জীবনে আছে—চাকরি, ভাড়া, কাজের চুক্তি, এমনকি দৈনন্দিন সম্পর্কেও।
দ্বিতীয়ত, নাগরিককে জানতে হবে তার অধিকার কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ। অজ্ঞতা সবসময় দুর্বলতার জায়গা তৈরি করে। আর এই দুর্বলতার ফাঁক দিয়েই অন্যরা সুবিধা নেয়।
তৃতীয়ত, আইনি সহায়তা ব্যবস্থা সহজ হতে হবে। শুধু আইন থাকা যথেষ্ট না, সেটার ব্যবহার সহজ না হলে সেটা কাগজে লেখা ন্যায় ছাড়া আর কিছু না।
আপনি আজই জানুন আপনার এলাকার লিগ্যাল এইড অফিস (সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্র) কোথায়। আপনার চারপাশের মানুষকে জিজ্ঞেস করুন দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে ওভারটাইম পায় কিনা, বা ভাড়া বাসা থেকে মালিক ইচ্ছামতো বের করে দিতে পারে কিনা জানে কিনা। কারণ অধিকার দাবি করা শুরু হয় জানার মধ্য দিয়ে, বড় কোনো সিস্টেম পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থেকে।
আইন করুণা নয়, এটা কাঠামো—আর কাঠামো দাঁড়ায় তখনই, যখন মানুষ মাথা নিচু করে নয়, মাথা উঁচু করে দাবি করতে শেখে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।