সফলতার আলোর পিছনে অদৃশ্য অন্ধকার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৫ মার্চ ২০২৬
২০১৭ সালের এক সন্ধ্যা। ঢাকার মোহাম্মদপুরের ছোট অফিসঘর। দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার, একটি পুরোনো টেবিল, কোণের দেয়ালে খসে পড়া রঙ—একসময় সবুজ, এখন ধূসর। রাসেল বসে ছিল নোটবুকের পাশে। তিন মাসের ভাড়া বাকি। চেয়ার দুটির একটি বিক্রি হয়ে গেছে। ফোন বারবার বেজে উঠছিল, কিন্তু সে ধরেনি। ঋণের কথা? শুধু নোটবুক। সে লিখছিল, মুছছিল, আবার লিখছিল। আর কতদিন—তিন মাস, দুই মাস, এক মাস, কিংবা এক সপ্তাহ।
ঝাপসা আলো, চারপাশে অন্ধকার। ভেতরে শূন্যতা—যা কেউ দেখেনি, যা সে নিজেও বোঝেনি। সেই রাতে রাসেল জানত না—পরের দিন কি হবে। কতদিন টিকে থাকা যাবে। কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। শুধু একটি ঘর, একটি টেবিল, আর হাতে কলম। আর সেই অদ্ভুত জেদ—যা থামতে দেয় না, যদিও থামা উচিত মনে হয়।
আজ রাসেলের কোম্পানির নাম অনেকে জানে—অ্যাপেক্স ল্যাবস। তাকে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে বলা হয়—"সফলতার গল্প বলুন।" সে হাসে। কেউ জানতে চায় না—সেই হাসির আগে কত রাত কেটেছে নিরবে। কেউ দেখেনি ধূসর দেয়াল, একক চেয়ার, সেই নোটবুক। আমি জানি।
শেষটা মনে থাকে। করতালি, স্বীকৃতি, আলো। মাঝখানের অংশ? ফিকে। দ্বিধা গল্পের বাইরে পড়ে গেছে। সরিয়ে দিয়েছি। কারণ দ্বিধা দেখতে ভালো লাগে না। আমরা চাই পরিষ্কার গল্প। শুরু, সংগ্রাম, সাফল্য। মাঝখানে কষ্ট থাকে, নিয়ন্ত্রিত। বাস্তবে তা হয় না। বাস্তবে কষ্টের অর্থ থাকে না। থাকে শুধু কষ্ট। থাকে সন্দেহ। থাকে প্রশ্ন—ঠিক আছে তো?
নতুন কিছু শুরু করলে পরিকল্পনা থাকে না। থাকে কেবল একটি ধারণা—যা পরে ভুলও হতে পারে। অর্ধেক বিশ্বাসে নেওয়া হয় সিদ্ধান্ত। কিছু রাত আসে, যখন মনে হয়—থামলে ভাল। তবু কিছু ঠেকছে না। শেষ কোথায়? জানা নেই। জানতে চাওয়াও নিষেধ। কারণ জানলে হয়তো আর এগোনো যায় না। এই সন্দেহ গল্পে আসে না। আসে না। কিন্তু বাস্তবে এই সন্দেহই সবচেয়ে সত্য। সবচেয়ে মানবিক। রাসেলের সেই রাতগুলো ছিল এমনই—প্রশ্ন, সন্দেহ, আর তবু এগিয়ে যাওয়া।
একদিন, ছাত্রের কথার আগে, রাসেল নিজের ঘরে মন খারাপ করে বলল:
"আমার জানা নেই, শেষ ঠিক কোথায়। তবু থামতে পারি না।"
ছাত্রটি তখন বলল:
"আমি জানি না আমি ঠিক করছি কি না। কিন্তু থামলে মনে হবে এতদিনের চেষ্টা অর্থহীন।"
নিশ্চিত নয়, তবু এগিয়ে যাওয়া। কারণ থামলে সব অর্থহীন হয়ে যেত। ভীতির সেই অনুভূতিই অজান্তে টেনে নিয়ে যায়। কেউ এ কথা বলে না। বলা যায় না। বাস্তবে ভীতি ছাড়া কোনো সংগ্রাম হয় না। রাসেল জানত। সেই ছাত্রও জানত। আমি দেখেছিলাম দুজনকেই।
সফলতার গল্পে চোখে পড়ে শুধু ফলাফল। পরিষ্কার, দৃশ্যমান। ছবি তোলা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা যায়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তগুলো ততটা পরিষ্কার নয়। তখন কেউ জানে না, শেষটা কেমন হবে। শুধু একটি সম্ভাবনা। মাত্র সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাকে ধরে রাখা—দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। কেউ দেখে না। কেউ বোঝে না। কেউ করতালি দেয় না।
বছরগুলো নীরব। একাকী। সকাল থেকে রাত, রাত থেকে সকাল। একই ঘর, একই চেয়ার, একই অজানা। কেউ সেই সময়ের ব্যথা বোঝে না। সেই রাতের অন্ধকার দেখেনি, যেখানে আশা ধীরে ধীরে নিভে পড়েছে। কেউ জানে না—হাল ছেড়ে আবার ধরা। কতবার। কত রাত। কেউ গোনে না। রাসেল গোনেনি। আমি জানি।
চেষ্টা। ব্যর্থতা। ভাঙা স্বপ্ন। সেই মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তখন মানুষ একা। পুরোপুরি একা। কেউ পাশে নেই। কেউ বলেনি—হবে। কেউ করতালি দেয়নি। কেউ বিশ্বাস করেনি। শুধু সে নিজে। আর সেই অদ্ভুত বিশ্বাস—যা কেউ দেখেনি, যা প্রমাণ ছিল না। রাসেলের গলায় কথা আটকে গিয়েছিল। আমি দেখেছি।
কিছু মানুষ সেই সম্ভাবনাকে আঁকড়ে ধরে। অনেক দিন ধরে। বছরের পর বছর। তারপর যখন তারা সফল হয়, গল্পটা সহজ হয়ে যায়। মনে হয় সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটেছে। কিন্তু আসলে তা ছিল না। কিছুই ছিল না—শুধু সন্দেহ আর ভীতি। তবু তারা এগোয়। আর সেই ভীতির মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে একদিন পৌঁছে গেছে। কেউ জানে না কখন। কিভাবে। শুধু পৌঁছেছে। রাসেল পৌঁছেছে। সেই ছাত্র? হয়তো পৌঁছেছে। হয়তো না। কিন্তু দুজনেই চেষ্টা করেছে। এটাই গুরুত্বপূর্ণ।
আলো উজ্জ্বল। অবশ্যই উজ্জ্বল। কিন্তু সেই আলো আসার আগে যে দীর্ঘ, নিঃশব্দ অন্ধকার ছিল—সেটা ধীরে ধীরে মুছে যায়। কেউ মনে রাখে না। কেউ চায়ও না মনে রাখতে। আমি আলো দেখি। সেটাই গল্প। অন্ধকারও ছিল—নিশ্চিত, নীরব, একা।
যে দেখে শুধু আলো, সে বোঝে না—আলোটা কতবার নিভে পড়েছিল। কতবার আবার জ্বলে উঠেছিল। কেউ জানে না। জানবেও না। কারণ আলো দেখতে ভালো লাগে। অন্ধকার স্মরণযোগ্য নয়। কঠিন পথ মানেই ভুল পথ নয়। সেই পথেই—শেষ পর্যন্ত। যদি যাওয়া যায়। যদি থামতে না হয়। যদি সেই অদৃশ্য বিশ্বাসটা ধরে রাখা যায়।
রাসেল ধরে রেখেছিল। কিভাবে? জানে না। শুধু জানে—সেই নোটবুক এখনো কোথাও আছে। হারায়নি। ফেলেও দেয়নি। লুকিয়ে রেখেছে। যেন সেই রাত, সেই ঘর, সেই একাকী লড়াই কখনো হারিয়ে না যায়। আর কতদিন টিকে থাকা যাবে—কারো জানা নেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।