ছোট কথার বড় আঘাত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষনধর্মী। ২০ নভেম্বর ২০২৫
গতকাল অফিসের লিফটে উঠেছি। সঙ্গে আরেকজন সহকর্মী, নতুন জয়েন করেছে। আমি হাসি দিয়ে বললাম,
“কেমন লাগছে প্রথম সপ্তাহ?”
সে একটু হেসে বলল,
“ভালোই, তবে একটু বেশি চাপ।”
তখন পাশে দাঁড়ানো আরেক সিনিয়র হঠাৎ বলে উঠলেন,
“আরে চাপ তো এখন থেকেই, এরপর দেখো কী হয়!”
আর তার সঙ্গে একটা হাসি। হাসিটা ছিল হালকা, কিন্তু নতুন ছেলেটার মুখটা মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। আমি দেখেছি। লিফট থেকে নেমে সে আর কারও সঙ্গে কথা বলেনি সারাদিন।
এই ছোট্ট হাসি, এই একটা কথা। কিছুই না। কিন্তু এই ধরনের ছোট ছোট কথা, ঠাট্টা, ইঙ্গিত, চোখ টিপে হাসা—এগুলোই আমাদের সমাজের ভেতরে ধীরে ধীরে ফাটল ধরাচ্ছে। আমরা বুঝতেও পারি না।
আমার এক বন্ধু আছে, নাম সুমি। গ্রাম থেকে এসে ঢাকায় চাকরি করে। ওর উচ্চারণ একটু গ্রাম্য। অফিসে মিটিংয়ে কথা বলার সময় কয়েকজন হালকা হেসে ওঠে।
কেউ বলে, “আরে, কী যে বলো!”
কেউ বলে, “একটু ঢাকাইয়া করে বলো না!”
সুমি হাসে বাইরে থেকে। কিন্তু একদিন আমাকে বলেছিল, “জাহিদ, আমি এখন আর মিটিংয়ে কথা বলতে চাই না। আমার কথা শুনে যদি সবাই হাসে, তাহলে চুপ থাকাই ভালো।”
ও আর কোনোদিন প্রেজেন্টেশন দেয়নি।
এই হলো ক্ষুদ্র আচরণের বিষ। এটা বড় কোনো গালি নয়, বড় কোনো অপমান নয়। কিন্তু বারবার লাগে। আর যে লাগে, সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
আমার ছোট বোন স্কুলে পড়ে। ও একটু মোটা। ক্লাসের ছেলেরা ওকে “ভূমিকম্প” বলে ডাকে। হাসাহাসি করে। ও বাড়ি এসে কাঁদে। আমি বলি, “বলিস না ওদের কিছু?”
ও বলে, “বললে আরও বেশি বলবে।”
তাই ও এখন ক্লাসে একদম পিছনের বেঞ্চে বসে। কারও সঙ্গে মিশে না। ওর বাবা-মা ভাবছে, মেয়ে লজ্জায় পড়েছে। আসলে ওকে লজ্জা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অনলাইনেও একই। ফেসবুকে একটা ছবি দিলেই কেউ লিখে,
“একটু ফিল্টার দিলে হতো না?”
কেউ লিখে, “এই ড্রেসটা তোমার গায়ে মানায়নি।” হালকা কথা। কিন্তু যে পড়ে, তার মনে একটা আঁচড় লাগে।
আমি নিজেও একবার ভুক্তভোগী হয়েছি। আমি গ্রাম থেকে এসেছি । ঢাকায় পড়ার সময় হলে থাকতাম। একদিন হলের ডাইনিংয়ে বসে খাচ্ছি। আমি একটু জোরে চিবোই। পাশের ছেলে বলল, “ভাই, গ্রাম থেকে এসেছেন বুঝলাম!” সবাই হাসল। আমি হাসলাম। কিন্তু সেই থেকে আমি হলে আর জোরে খাইনি। বরং খাওয়ার সময় একদম চুপ করে থাকতাম।
এই ছোট ছোট কথা মানুষকে কোণঠাসা করে দেয়। তারা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে যায়। সমাজের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। যারা বারবার এই আঘাত পায়, তারা একসময় ভাবতে শুরু করে—আমি এখানে থাকার যোগ্যই না।
কিন্তু এর সমাধানও আমাদের হাতে।
আমি এখন চেষ্টা করি। অফিসে কেউ নতুন এলে আমি ওর সঙ্গে বেশি কথা বলি। ওর কথা শুনি। কেউ যদি কারও উচ্চারণ নিয়ে হাসে, আমি বলি, “আরে, আমারও তো একসময় এমন ছিল। কোনো ব্যাপার না।”
ছোট বোনের স্কুলে গিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছি। এখন ওরা সচেতন।
আমি বিশ্বাস করি, যদি আমরা প্রতিটি ছোট কথার আগে একবার ভাবি—এটা শুনে কারও মনে লাগবে কি না—তাহলে অনেক কিছু বদলে যাবে।
একটা হাসি যদি কাউকে আঘাত করে, তাহলে সেই হাসি না হাসাই ভালো।
একটা কথা যদি কাউকে ছোট করে, তাহলে সেই কথা না বলাই ভালো।
আমরা যদি এই ছোট ছোট জায়গায় সচেতন হই, তাহলে বড় বিভাজনগুলো আর তৈরি হবে না।
কারণ সমাজটা আসলে বড় বড় ঘটনা দিয়ে ভাঙে না। ভাঙে এই ছোট ছোট আঘাতে। আর গড়েও ওঠে ছোট ছোট সহানুভূতিতে।
আমি আমার ছোট বোনকে বলেছি,
“তোকে কেউ কিছু বললে আমাকে বলবি।
আমি থাকতে তোকে কেউ ছোট করতে পারবে না।”
ও হেসে বলেছে,
“তুই থাকলে আমার ভয় লাগে না।”
আপনাদেট জন্য একটা প্রশ্ন রাখলাম:
আপনার জীবনে এমন কোনো একটা ছোট কথা বা হালকা ঠাট্টা আছে, যেটা শুনে আপনার মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল, আর সেই থেকে আপনি নিজেকে একটু বদলে ফেলেছেন বা গুটিয়ে নিয়েছেন?
কমেন্টে লিখে ফেলুন সেই মুহূর্তটা।
চাইলে নাম না দিয়েও লিখতে পারেন।
জানাতে চাই, আপনি একা নন।
#মানসিকস্বাস্থ্য #সহানুভূতি #ছোটকথারবড়আঘাত #আমরাএকসাথে #কথারদায়
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।