সবার খোঁজ নেন, নিজেরটা নয়Upload failed: [object Object]
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
বিষণ্নতা ও বাইরে স্বাভাবিক থাকার চাপ
১৯ অক্টোবর ২০২৬
সকাল থেকে তিনি সবার রান্না করেন, সন্তানের স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন, ঘরের কাজ সামলান। দুপুরে আত্মীয় এলে হাসিমুখে কথা বলেন, চা এগিয়ে দেন, কার কী লাগবে মনে রাখেন। তাঁকে দেখে কারও মনে হয় না, এই মানুষটিরও কখনো বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। অথচ রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসলে পরদিন সকালের কথা ভাবতেও তাঁর কষ্ট হয়। আবারও সেই রান্না, সেই দায়িত্ব, সবার মুখের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা।
তাঁর দিন শেষ হয়। কিন্তু ক্লান্তিটা শেষ হয় না।
পরিবারের মানুষ তাঁকে চেনে একজন দায়িত্বশীল নারী হিসেবে। সংসারে কী নেই, কার কী দরকার, কোন কাজটা বাকি—এসব তাঁর নখদর্পণে। সন্তানের পরীক্ষার তারিখ মনে থাকে, স্বামীর পছন্দের খাবার ভুল হয় না, অসুস্থ শাশুড়ির ওষুধের সময়ও তিনি খেয়াল রাখেন। অথচ নিজের ভেতরে কী চলছে, সে খবর রাখার সময় যেন তাঁর নেই। শুধু সময়ের অভাব নয়, কখনো কখনো নিজের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়ার অভ্যাসটুকুও হারিয়ে যায়।
কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলে, ‘কেমন আছো?’ তিনি হয়তো বলবেন, ‘ভালো আছি।’ কথাটা বলতে তাঁর বিশেষ কষ্ট হয় না। কারণ, এই উত্তরটি তিনি বহুবার দিয়েছেন। কখনো আত্মীয়দের সামনে, কখনো প্রতিবেশীর কাছে, কখনো নিজের কাছেও।
কিন্তু ভালো থাকার কথাটা বলতে পারা আর সত্যিই ভালো থাকা এক নয়।
আমাদের সমাজে একজন নারীর কাছ থেকে অনেক সময় এমন এক ধরনের সক্ষমতা আশা করা হয়, যার কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই। সংসারের কাজ করবেন, সন্তানদের দেখবেন, বয়স্কদের যত্ন নেবেন, সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখবেন। নিজের শরীর খারাপ হলেও যতটা সম্ভব কাজ চালিয়ে যাবেন। মন খারাপ থাকলেও অন্যদের সামনে সেই মন খারাপের বোঝা নামিয়ে রাখবেন না।
তিনি যদি একদিন বলেন, আজ আর পারছেন না, তখন প্রশ্ন আসে—কেন? সারাদিন এমন কী কাজ করো? অন্যরা তো সব সামলায়!
এই তুলনাগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু যাঁর কষ্টের কথা বলা হচ্ছে, তাঁর কাছে এগুলো নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করার আরেকটি কারণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি ভাবতে শুরু করেন, এত কিছু থাকার পরও কেন তাঁর মন ভালো নেই? সংসারে সবাই আছে, মাথার ওপর ছাদ আছে, সন্তান আছে—তাহলে তাঁর কষ্ট পাওয়ার অধিকার কোথায়?
মানুষের কষ্টের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই। জীবনে বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলেই শুধু বিষণ্নতা দেখা দেবে, এমন নয়। আবার সংসারের চাপ কিংবা দীর্ঘদিনের ক্লান্তি থাকলেই কাউকে বিষণ্নতায় আক্রান্ত বলা যায় না। বিষয়টি বুঝতে হলে তাঁর অনুভূতি, আচরণের পরিবর্তন, কত দিন ধরে এমন চলছে এবং দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব পড়ছে—সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।
বিষণ্নতা সব সময় চোখের জলে ধরা পড়ে না। কেউ আগের পছন্দের কাজে আনন্দ পান না, কারও ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাস বদলে যায়, কারও কাছে সাধারণ কাজও অসহনীয় ভারী মনে হয়। কেউ এসব কষ্টের মধ্যেও সংসারের দায়িত্ব পালন করে যান। তাই বাইরে থেকে তাঁকে কর্মব্যস্ত দেখেই ধরে নেওয়া যায় না যে তিনি ভালো আছেন। দীর্ঘদিন এমন লক্ষণ চললে এবং জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেললে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে শুধু ক্লান্তি বা চুপচাপ থাকাকে বিষণ্নতার নিশ্চিত লক্ষণ বলা যায় না।
সেই নারীর দিকে তাকালে হয়তো দেখা যাবে, তিনি এখনো রান্না করছেন, কাপড় ভাঁজ করছেন, সন্তানের খাতা দেখছেন। কিন্তু যে কাজগুলো আগে সহজেই করতেন, এখন সেগুলোর জন্য তাঁকে নিজের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বোঝাপড়া করতে হয়। সকালে বিছানা ছেড়ে ওঠার আগে মনে হয়, আর একটু শুয়ে থাকি। তারপর সন্তানের স্কুলের কথা মনে পড়ে। তিনি উঠে পড়েন।
কেউ তাঁর এই উঠে পড়াটুকু দেখেন। কিন্তু ওঠার আগে কতটা মানসিক শক্তি খরচ হয়েছে, তা জানেন না।
এখানে একটি ভুল ধারণা কাজ করে—দায়িত্ব পালন করতে পারলে নিশ্চয়ই মানুষটি ভালো আছেন। অথচ অনেক সময় দায়িত্বই হয়ে ওঠে তাঁর কষ্ট লুকিয়ে রাখার উপায়। কাজ থামালে হয়তো নিজের ভেতরের শূন্যতার মুখোমুখি হতে হবে, তাই তিনি কাজ করে যান। অন্যদের প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে নিজের প্রয়োজনগুলোকে পিছিয়ে দেন। একসময় তিনি নিজেও ভুলে যেতে পারেন, তাঁর কী ভালো লাগে, কীসে স্বস্তি মেলে, কিংবা শেষ কবে নিজের ইচ্ছায় কোথাও বসেছিলেন।
এ অবস্থায় পরিবারের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু খাবার তৈরি হয়েছে কি না, সন্তানের পড়া হয়েছে কি না, ঘর গোছানো আছে কি না—এসব দেখলেই একজন মানুষের খোঁজ নেওয়া হয় না। সংসারের কাজ শেষ হওয়ার পরও তাঁর পাশে বসার প্রয়োজন আছে। তিনি কিছু বলতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দেওয়ার বদলে তাঁর কথা শোনার প্রয়োজন আছে।
‘তোমার তো সব আছে, মন খারাপের কী আছে?’—এই প্রশ্নের বদলে বলা যায়, ‘তোমাকে কিছুদিন ধরে ক্লান্ত লাগছে। তুমি কি কোনো কষ্টের মধ্যে আছো? চাইলে আমাকে বলতে পারো।’
এই কথার মধ্যে অভিযোগ নেই, প্রতিযোগিতা নেই, কষ্টের বৈধতা প্রমাণ করার শর্তও নেই। আছে কথা বলার একটি সুযোগ।
তবে পরিবারের পক্ষ থেকে সহানুভূতি দেখানোই সব সময় যথেষ্ট নয়। যদি দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ থাকে, আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ কমে যায়, ঘুম বা খাওয়ার পরিবর্তন ঘটে, শক্তি ও মনোযোগ কমে আসে কিংবা নিজের সম্পর্কে গভীর হতাশা তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। এমন লক্ষণ বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যদিও শুধু কয়েকটি লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করা যায় না। চিকিৎসক বা যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বললে পরিস্থিতি বোঝা এবং উপযুক্ত সহায়তা নেওয়া সহজ হয়।
চিকিৎসা মানেই সবাইকে একই ওষুধ খেতে হবে, এমন নয়। ব্যক্তির অবস্থার ওপর নির্ভর করে মনোচিকিৎসা, জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন কিংবা ওষুধের সহায়তা লাগতে পারে। পাশাপাশি সংসারের কাজ ভাগ করে দেওয়া, বিশ্রামের সুযোগ তৈরি করা এবং তাঁর নিজের জন্য কিছু সময় নিশ্চিত করাও বাস্তব সহায়তার অংশ। শুধু ‘নিজের যত্ন নাও’ বললে হবে না; সেই যত্ন নেওয়ার সুযোগটাও তৈরি করে দিতে হবে।
আর নারীর নিজের কাছেও একটি প্রশ্ন থাকা দরকার—সবাইকে সামলানোর দায়িত্ব কি একা তাঁরই? বিশ্রাম নিতে গেলে কি তাঁকে অপরাধবোধে ভুগতে হবে? নিজের কষ্টের কথা বলার আগে কি তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি যথেষ্ট কাজ করেছেন?
সংসারের জন্য তাঁর অবদান মূল্যবান। কিন্তু সেই অবদানের বিনিময়ে নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তিনি মা, স্ত্রী, মেয়ে কিংবা পুত্রবধূ—এসব পরিচয়ের বাইরেও একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তাঁরও মন খারাপ হতে পারে, তাঁরও সাহায্য দরকার হতে পারে। সব সময় শক্ত থাকার অভিনয় করতে করতে ভেতরে ভেঙে পড়লে সেটাকে ত্যাগের মহিমা বলে চালিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
রাতে মেয়েটি মায়ের ঘরে ঢুকল। মা তখন পরদিনের স্কুলের জামাটা ভাঁজ করছিলেন। জামার হাতা দুটো মিলিয়ে ভাঁজ করলেন, তারপর বিছানার এক পাশে রেখে দিলেন।
মেয়ে কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি সবার খোঁজ নাও, তোমার খোঁজ কে নেয়?’
মা উত্তর দিলেন না।
শুধু জামাটার ভাঁজটা আবার ঠিক করলেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।