ক্ষুধার্ত পেটে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সবসময় দোদুল্যমান
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । মে ১৭, ২০২৬
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। নিউমার্কেটের পাশের ছোট্ট হোটেলটার সামনে রিকশাটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা। সারাদিনে তার আয় হয়েছে দেড়শো টাকার মতো। ভাড়া, গ্যারেজ, ওষুধ—সব বাদ দিলে হাতে খুব বেশি কিছু থাকার কথা না। তবু সে দাঁড়িয়ে ছিল।
কাচের ভেতর মানুষ খাচ্ছিল। ধোঁয়া উঠছিল গরুর মাংস থেকে। এক বাচ্চা ছেলে ঠোঁটে সস মেখে হেসে উঠল। লোকটা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নিল।
রিকশার সিটের ছেঁড়া রেক্সিনে তার শার্টটা বারবার আটকে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে যদি কেউ ঈশ্বর সম্পর্কে প্রশ্ন করত, সে হয়তো কোনো দার্শনিক উত্তর দিত না। হয়তো শুধু বলত, “আল্লাহ থাকলে মানুষ এত কষ্টে থাকে কেন?”
খালি পেটে মানুষ ধর্মতত্ত্ব বোঝে না। সে আগে ভাত বোঝে। অপেক্ষা বোঝে। রান্নাঘরের গন্ধ বোঝে। মাগরিবের পর হোটেলের সামনে দাঁড়ালে অনেক সময় ঈমানও ভাতের কাছে হেরে যায়।
আমরা বিশ্বাসকে খুব স্থির একটা জিনিস হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি। যেন মানুষের ভেতরের আস্থা সব পরিস্থিতিতে একই রকম থাকবে। কিন্তু অভাব মানুষের ভেতরের ভাষা বদলে দেয়। যে মানুষ প্রতিদিন অপমান আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে বাঁচে, তার প্রার্থনাও অন্যরকম হয়। হয়তো সে একই রাতে নামাজ পড়ে, আবার সেই নামাজের ভেতরেই অভিযোগ লুকিয়ে রাখে।
একটা সমাজে যখন একজন মানুষ সারাদিন শ্রম দিয়েও সন্তানের জন্য দুধ কিনতে পারে না, তখন তার ঈশ্বর নিয়ে প্রশ্ন আসলে সমাজের প্রতিও প্রশ্ন। কেন একজন মানুষের প্লেটে খাবার নষ্ট হয়, আর আরেকজন মানুষ হোটেলের কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে গন্ধ শুঁকে বাড়ি ফিরে যায়?
তবু অভাব সবসময় মানুষকে নিষ্ঠুর বানায় না। অনেক সময় উল্টোটা ঘটে। যে মানুষ নিজে না খেয়ে থেকেছে, সে অন্যের ক্ষুধা দ্রুত বুঝতে পারে। গ্রামে এখনো দেখা যায়—ঘরে তরকারি কম, তবু অতিথিকে বসিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। হয়তো ভাতের সঙ্গে শুধু ডাল। তবু ভাগ করে খাচ্ছে।
যে মানুষটা সত্যিই ক্ষুধার মধ্যে আছে, তার কাছে দর্শনের ভাষা অনেক সময় বিলাসিতা মনে হতে পারে। কারণ দীর্ঘ অভাব মানুষকে ক্লান্ত করে দেয়। তখন সৌন্দর্যও দূরের জিনিস মনে হয়।
“ক্ষুধার্ত পেটে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সবসময় দোদুল্যমান” — বাক্যটা তাই শুধু বিশ্বাসের সংকটের কথা বলে না। উঁচু বিল্ডিং দিয়ে শহর মাপা যায় না। মাপা যায় রাত সাড়ে দশটায় কয়জন মানুষ হোটেলের কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, তা দিয়ে।
তবু মানুষ পরদিন আবার বের হয়। আবার রিকশা চালায়। ছেঁড়া রেক্সিনে আবার শার্ট আটকায়। সে শার্ট ছাড়ায়, রিকশা টানে।
আকাশের দিকে তাকায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।