অবহেলা আর মূ
ল্য
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
মোটিভেশনাল গল্প। জানুয়ারি ০৪,২০২৬
আমার জীবনের একটা সময় এসেছিল যখন মনে হতো, আমি যেন অদৃশ্য হয়ে গেছি। আমার নাম রায়হান। ঢাকার একটা মাঝারি কোম্পানিতে মার্কেটিংয়ে কাজ করি।
প্রতিদিন অফিসে গিয়ে নতুন আইডিয়া নিয়ে যাই, কিন্তু মিটিংয়ে বললেও কেউ কান দেয় না। সবাই ফোনে মগ্ন, বা নিজেদের কথায় ব্যস্ত। একদিন একটা বড় প্রজেক্টের মিটিংয়ে আমি আমার প্ল্যানটা বিস্তারিত বললাম—কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন ক্যাম্পেইন চালিয়ে কাস্টমার বাড়ানো যায়। শেষ হলে কেউ একটা কথাও বলল না। না প্রশংসা, না সমালোচনা। শুধু সবাই উঠে চলে গেল।
বাড়ি ফিরে আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলাম। চোখের নিচে কালো দাগ, মুখে অবসাদের রেখা। মনে একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরছে: আমি কি এতটাই অপ্রয়োজনীয়?
এই অবহেলা আমাকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলছিল। আমি আরও বেশি চেষ্টা করলাম—অফিসে লেট করে থাকা, উইকেন্ডে কাজ করা, সবকিছু করে প্রমাণ করতে চাইলাম যে আমি দরকারি। কিন্তু যত দিচ্ছিলাম, ততই নিজেকে ছোট লাগছিল। রাতে ঘুম হতো না, দিনে মন খারাপ থাকত। বন্ধুরা বলত, “তুই বড্ড সিরিয়াস হয়ে গেছিস।”
একটা শীতের বিকেলে, অফিস থেকে বেরিয়ে আমি আমার পুরোনো এলাকার একটা চায়ের দোকানে বসলাম। মন ভারী। পাশের টেবিলে একজন বুড়ো চাচা বসে ছিলেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বললেন, “বাবা, দামি জিনিস কখনো দোকানের সামনে রাখা হয় না। অনেক কিছু থাকে তালাবদ্ধ আলমারিতে। যে সত্যি কিনতে চায়, সে খুঁজে নেয়।”
এই কথাগুলো আমার মনে গেঁথে গেল। রাতে বাড়ি ফিরে অনেক ভাবলাম। সত্যি তো! যারা আমাকে বুঝছে না, তাদের জন্য এত ত্যাগ করার মানে কী?
যে আমার মূল্য দেবে, সে নিজে থেকে বুঝবে। আর যে বুঝবে না, তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে সময় নষ্ট করা। এই চিন্তাটা আমাকে নতুন শক্তি দিল।
পরদিন থেকে আমি বদলে গেলাম। অফিসে কাজ করি, কিন্তু আর কারো অনুমোদনের জন্য নিজেকে মারি না। ভুল হলে স্বীকার করি, নতুন শিখি।
যেখানে সম্মান নেই, সেখান থেকে দূরে সরে আসি। নিজের জন্য সময় বের করলাম—জিমে যাওয়া, বই পড়া, পরিবারের সাথে সময় কাটানো। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। অফিসের লোকজনও লক্ষ্য করতে শুরু করল।
একদিন একই মিটিংয়ে আমি কথা বললাম, আর একজন সিনিয়র বলল, “রায়হান, তোমার পয়েন্টটা ভালো। আরেকটু ডিটেলে বলো।” আমার মনটা ভরে গেল।
এখন অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে বাগান দেখি। একটা ছোট্ট গোলাপ ফুল ফুটেছে, রোদে ঝকঝক করছে। ভাবি, এই ফুলের মতোই আমি—কারো প্রশংসার অপেক্ষায় না থেকে নিজের সৌন্দর্য নিয়ে বেঁচে আছি।
জীবনে অনেকে চলে যায়, কিন্তু নিজের মূল্য যদি নিজের হাতে থাকে, কেউ কেড়ে নিতে পারে না। একদিন এক পুরোনো কলিগ ফোন করে বলল, “তুই তো অনেক চেঞ্জড।” আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ, এখন নিজেকে আর ছাড়ে দিই না।”
আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ যাকে সরিয়ে দেন, তা আমাদের ভালোর জন্যই। আর যা রেখে দেন, তা সবচেয়ে দামি।
অবহেলা আমাকে শিখিয়েছে নিজেকে ভালোবাসতে। সময় সব প্রমাণ করে। দামি জিনিসের কদর সবাই করতে পারে না—এটা মেনে নিয়ে নিজের পথে চলতে হবে।
নিজেকে এমন করে গড়ে তুলতে হবে যাতে আমরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠি।
#আত্মমর্যাদা #নিজেরমূল্য #জীবনেরশিক্ষা
#অবহেলা #মানবিকগল্প #বাংলালেখা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।