ধৈর্য ধরো বলাটা যথেষ্ট নয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
১ নভেম্বর ২০২৬
যে মানুষটি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের কণ্ঠ শুনতেন, তিনি হয়তো কোনো দিন ভাবেননি, এই সাধারণ ডাকটিই একসময় তাঁর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ শব্দ হয়ে উঠবে। মা চলে যাওয়ার পর ঘরের সবকিছু আগের জায়গায় থাকে। রান্নাঘরে হাঁড়ি থাকে, বিছানায় বালিশ থাকে, দরজার পাশে জুতাও থাকে। শুধু সেই ডাকটি আর শোনা যায় না। তখন বোঝা যায়, প্রতিদিনের পরিচিত একটি শব্দও কত বড় আশ্রয় হতে পারে।
যে মানুষটি দীর্ঘদিন অর্থকষ্টে কাটিয়েছেন, প্রথম বেতনের টাকা হাতে পাওয়ার অনুভূতি তাঁর কাছে অন্য রকম। হয়তো সেই টাকা দিয়ে তিনি খুব দামি কিছু কেনেননি। বাজার থেকে এক কেজি মাংস কিনে বাড়ি ফিরেছেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে খেয়েছেন। খাবারের দাম দিয়ে সেই আনন্দের হিসাব করা যাবে না। কারণ ওই খাবারের সঙ্গে মিশে ছিল অনেক দিনের অপেক্ষা, না-পারার কষ্ট এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বস্তি।
আমাদের জীবনে কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলোর গভীরতা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। কারও কাছে নিজের উপার্জনে সংসারের বাজার করাটা খুব সাধারণ ঘটনা। অথচ আরেকজনের কাছে সেটাই বহু বছরের অপূর্ণ স্বপ্ন। কেউ হয়তো প্রতিদিন বাবার সঙ্গে একই টেবিলে বসে খাওয়াকে স্বাভাবিক মনে করেন। আরেকজন বাবাকে হারানোর পর সেই টেবিলের একটি খালি চেয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। একই দৃশ্য একজনের কাছে দৈনন্দিন জীবন, অন্যজনের কাছে স্মৃতি।
কষ্ট আমাদের জীবনে এমন কিছু অভিজ্ঞতা যোগ করে, যা শুধু উপদেশ শুনে অর্জন করা যায় না। অভাবের মধ্যে থাকা মানুষ অনেক সময় অন্যের প্রয়োজন সহজে বুঝতে পারেন। অসুস্থতার দিন পার করা মানুষ সুস্থ শরীরের স্বাভাবিক কাজগুলোকে নতুন করে মূল্য দিতে শেখেন। ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়া মানুষ বুঝতে পারেন, সফলতার পেছনে শুধু মেধা নয়, ধৈর্য আর চেষ্টা করেও যেতে হয়।
তবে কষ্টের কথা বলতে গিয়ে একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। সব কষ্ট মানুষের জন্য ভালো নয়। কারও ওপর নির্যাতন, অবহেলা, অপমান কিংবা অন্যায় চাপিয়ে দিয়ে বলা যায় না, এসব তাকে শক্ত মানুষ বানাবে। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য কাউকে শুধু অভিজ্ঞ করে না, অনেক সময় তার স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাও কেড়ে নেয়। প্রিয়জনের মৃত্যু মানুষকে জীবনের মূল্য বোঝাতে পারে, কিন্তু সেই শোকের ভার বহন করা মোটেও সহজ নয়। তাই কষ্টকে মহিমান্বিত করার কোনো কারণ নেই। কষ্ট জীবনের বাস্তবতা, কিন্তু অন্যায়কে জীবনের নিয়ম বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়।
আমাদের সমাজে বিপদে পড়া মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার খুব পরিচিত একটি বাক্য আছে, ‘ধৈর্য ধরো, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কথাটি বলা সহজ। কিন্তু যিনি কথাটি শুনছেন, তাঁর জীবনে কী ঘটছে, তা না জেনে এমন আশ্বাস দেওয়া অনেক সময় অর্থহীন হয়ে পড়ে।
যার ঘরে খাবার নেই, তাকে শুধু ধৈর্যের কথা শুনিয়ে বিদায় দিলে তাঁর সমস্যার কিছুই বদলায় না। যে মানুষটি চাকরি হারিয়ে মাসের বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না, তাঁর কাছে ‘সময় ভালো হবে’ কথাটি সাময়িক সান্ত্বনা হতে পারে, কিন্তু বাড়িওয়ালার পাওনা মেটায় না। যে নারী সংসারের সবার জন্য রান্না করেন, অথচ নিজের অসুস্থতার কথা বলারও সুযোগ পান না, তাঁকে ধৈর্য ধরতে বলার আগে একদিন তাঁর রান্নাঘরের কাজগুলো ভাগ করে নেওয়া দরকার।
কখনো কখনো মানুষের কষ্ট কমানোর জন্য বড় কোনো আয়োজন লাগে না। বন্ধুর বিপদের কথা শুনে শুধু উপদেশ না দিয়ে তার পাশে বসা যায়। পরিচিত কেউ অসুস্থ হলে ফোন করে খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি ওষুধ আনার দায়িত্বও নেওয়া যায়। কারও আর্থিক সংকটের কথা জানলে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা যায়। সাহায্য করার সামর্থ্য না থাকলেও অন্তত এমন আচরণ করা যায়, যাতে বিপদে পড়া মানুষটি নিজের অসহায়ত্বের জন্য লজ্জিত না হন।
কষ্টের আরেকটি দিক আছে। এটি মানুষকে নিজের ভেতরের চেহারাটাও দেখিয়ে দেয়। ভালো সময়ে অনেক মানুষ পাশে থাকেন। কিন্তু বিপদের দিনে কে ফোন করেন, কে খবর নেন, কে সামান্য সময় বের করে দেখা করতে আসেন, তা তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার কখনো দেখা যায়, যাঁর কাছ থেকে সাহায্য আশা করিনি, তিনিই নীরবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমন অভিজ্ঞতা মানুষের সম্পর্ক দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। কে আপন, কে পর, তার হিসাব সব সময় রক্তের সম্পর্ক দিয়ে মেলে না।
জীবনের কষ্ট মানুষকে সব সময় একইভাবে বদলে দেয় না। কেউ কষ্ট পেয়ে সহানুভূতিশীল হন, কেউ আবার অন্যের প্রতি আরও কঠোর হয়ে ওঠেন। কেউ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অন্যকে আগলে রাখতে শেখেন, কেউ নিজের যন্ত্রণার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন। অর্থাৎ কষ্ট নিজে কাউকে ভালো মানুষ বানায় না। কষ্টের মধ্য দিয়ে মানুষ কীভাবে এগিয়ে যাবে, সেই সিদ্ধান্তই তার পরবর্তী জীবনকে প্রভাবিত করে।
তাই কারও কষ্টের কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে তার অভিজ্ঞতার অর্থ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই। সব ক্ষতির বদলে নতুন কিছু আসে না। সব অপেক্ষার শেষে কাঙ্ক্ষিত মানুষটি ফিরে আসেন না। সব পরিশ্রমের পুরস্কারও মেলে না। কিছু অপূর্ণতা মানুষকে নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়। এমন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে বড় বড় সান্ত্বনার চেয়ে আন্তরিক উপস্থিতি অনেক বেশি মূল্যবান।
আমরা অন্যের কষ্ট দূর করতে না-ও পারি। কিন্তু সেই কষ্টের সময় তাকে একা ফেলে না রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারি। সব সমস্যার সমাধান আমাদের হাতে নেই, কিন্তু কারও সমস্যাকে আরও ভারী করে তোলার দায় এড়িয়ে চলা আমাদের হাতেই আছে।
কেউ কষ্টে থাকলে তাঁকে শুধু ‘ধৈর্য ধরো’ বলবেন না। সম্ভব হলে জিজ্ঞেস করুন, তাঁর কী প্রয়োজন। তারপর নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ান। কারণ বিপদের সময় মানুষ সব সময় সমাধান খোঁজে না; কখনো শুধু এমন একজনকে খোঁজে, যাঁর সামনে নিজের অসহায়ত্ব লুকাতে হয় না।
জীবন সবার জন্য সহজ হবে না। অন্তত কঠিন সময়ে আমরা একে অন্যের জন্য একটু সহজ হয়ে উঠতে পারি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।