ভাবনার সঙ্গে লড়াই নয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৭ অক্টোবর ২০২৬
রাত দুটোয় সুমনের ঘুম ভেঙে গেল। কয়েক মাস আগে বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনের একটি মুহূর্ত মনে পড়েছে। সেদিন এমন একটা কথা বলেছিল, যা বলা উচিত হয়নি। বন্ধু কিছু বলেনি, কিন্তু সুমনের মনে হচ্ছে, কথাটা নিশ্চয়ই তার খারাপ লেগেছে।
সে পাশ ফিরে শোয়। নিজেকে বোঝায়, পুরোনো কথা ভেবে লাভ নেই। অথচ একটু পরেই মনে মনে কথোপকথনটা আবার শুরু করে। এবার সে অন্য উত্তর দেয়, নিজের পক্ষে যুক্তি সাজায়, বন্ধুর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার জবাব তৈরি করে। যতবার ভাবে, ‘এটা নিয়ে আর ভাবব না’, ততবারই কথাটা ফিরে আসে।
ভোরের দিকে ঘুম আসে। সকালে উঠে সুমনের মনে হয়, কয়েক মিনিটের একটি ঘটনা তার রাতের বড় একটা অংশ কেড়ে নিয়েছে।
সমস্যাটা শুধু পুরোনো কথা মনে পড়া নয়। সমস্যাটা হলো, চিন্তাটি মাথায় আসার পর সেটিকে জোর করে সরিয়ে দিতে গিয়ে সে তার সঙ্গেই আটকে গেছে।
মনের সঙ্গে টানাপোড়েন
আমাদের মনেও এমন অনেক কথা আসে, যা আমরা ভাবতে চাই না। পুরোনো অপমান, ভবিষ্যতের আশঙ্কা, নিজের ভুল কিংবা কারও প্রতি জমে থাকা রাগ—কখনো এগুলো অপ্রত্যাশিতভাবেই ফিরে আসে।
তখন আমরা নিজেদের ধমক দিই, ‘এমন ভাবা যাবে না।’ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই, আজ থেকে আর এসব নিয়ে ভাবব না। কিন্তু যে চিন্তাকে সরিয়ে দিতে চাই, বারবার তার দিকেই মনোযোগ দিতে হয়। সে চলে গেছে কি না, তা দেখার জন্যও তাকে মনে করতে হয়।
একসময় চিন্তাটির চেয়ে সেটিকে থামানোর চেষ্টাই বেশি ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে আরেকটি সমস্যা জড়িয়ে আছে। আমরা মনে যা আসে, অনেক সময় তাকেই নিজের পরিচয় বলে ধরে নিই। রাগের চিন্তা এলে নিজেকে খারাপ মানুষ ভাবি, ব্যর্থতার আশঙ্কা এলে নিজেকে অযোগ্য মনে করি। অথচ মনে কোনো ভাবনা আসা আর সেটিকে বিশ্বাস করা বা সেই অনুযায়ী কাজ করা এক বিষয় নয়।
একজন মানুষ ব্যর্থ হওয়ার কথা ভাবতে পারেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি ব্যর্থ হবেনই। কারও ওপর রাগ হতে পারে, কিন্তু সেই রাগ তাঁকে অন্যায় করতেই বাধ্য করবে, এমনও নয়।
মনের মধ্যে একটি চিন্তা এসেছে বলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না, সেটি আমাদের পরিচয়ও হয়ে যায় না।
চিন্তার হাতে নিজের সময়
একজন তরুণ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কাজের একটি ভুল নিয়ে তাঁর মনে সন্দেহ তৈরি হলো—সহকর্মীরা নিশ্চয়ই তাঁকে অযোগ্য ভাবছে। পরদিন অফিসে গিয়ে তিনি সবার মুখের দিকে খেয়াল করেন। কেউ কম কথা বললে মনে হয়, তাঁর ওপর বিরক্ত। কেউ ব্যস্ত থাকলে মনে হয়, তাঁকে এড়িয়ে চলছে।
যে ভুলটি হয়তো কয়েক মিনিটে ঠিক করা সম্ভব ছিল, সেটি নিয়ে তিনি দিনের পর দিন অস্থির থাকেন। কাজ শেখার বদলে নিজের সম্পর্কে অন্যদের ধারণা কী, তা অনুমান করতেই তাঁর মন ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এখানে বাস্তব ভুল থাকলে সেটি শুধরে নেওয়া দরকার। কিন্তু অন্যরা কী ভাবছে, সে সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া বারবার অনুমান করা কোনো সমাধান নয়। একই আশঙ্কা যতবার ফিরে আসে, ততবারই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আমরা প্রায়ই মনে করি, কোনো বিষয় নিয়ে যথেষ্ট ভাবতে পারলে নিশ্চয়ই নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু কিছু প্রশ্নের উত্তর আমাদের হাতে থাকে না। অতীতের প্রতিটি মুহূর্ত বদলানো যায় না, অন্য মানুষের মনের খবরও সব সময় জানা যায় না। ভবিষ্যতের সব অনিশ্চয়তা দূর করেও নিশ্চিন্ত থাকা সম্ভব নয়।
তবু মনকে থামাতে না পেরে আমরা একই ঘটনা নতুন নতুনভাবে বিচার করি। এতে ঘটনা বদলায় না, শুধু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ক্লান্তি বাড়ে।
সচেতন থাকার অর্থ
চিন্তা এলেই তাকে তাড়ানোর চেষ্টা না করে একটু লক্ষ করা যায়। নিজের মনে বলা যায়, ‘আমি এখন একটা পুরোনো ঘটনা নিয়ে ভাবছি’ কিংবা ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার ভয় হচ্ছে।’
এতে চিন্তাটি সঙ্গে সঙ্গে চলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ভাবনাটিকে সত্য ধরে নিয়ে তার সঙ্গে লড়াই শুরু না করার সুযোগ তৈরি হয়।
সুমনের কথাই ধরা যাক। তার যদি সত্যিই মনে হয়, বন্ধুকে কষ্ট দিয়েছে, তাহলে উপযুক্ত সময়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে পারে, প্রয়োজনে ক্ষমাও চাইতে পারে। কিন্তু নতুন কিছু করার না থাকলে একই কথোপকথন মনে মনে বারবার চালিয়ে যাওয়ায় সমস্যার সমাধান হবে না।
সচেতনতা মানে সব চিন্তাকে উপেক্ষা করা নয়। কোনো চিন্তা বাস্তব সমস্যার ইঙ্গিত দিলে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু একই আশঙ্কা নতুন কোনো তথ্য ছাড়াই ফিরে এলে সেটিকে প্রতিবার গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করতেই হবে, এমন নয়।
মন আবার পুরোনো চিন্তায় ফিরে যেতে পারে। তখন নিজের ওপর বিরক্ত না হয়ে খেয়াল করা যায়, মন আবার সেই জায়গায় আটকে গেছে। এরপর ধীরে ধীরে বর্তমান কাজের দিকে মন ফেরানো যায়। এই অভ্যাস গড়ে উঠতে সময় লাগতে পারে। চিন্তা যদি দীর্ঘদিন ঘুম, কাজ বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নেওয়াও ভালো সিদ্ধান্ত।
নিজের জন্য একটু জায়গা
আমরা ঘরের অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলতে পারি। তাই হয়তো ভাবি, মনের অপছন্দের চিন্তাগুলোও জোর করে সরিয়ে দিলেই শান্তি আসবে। কিন্তু মন কোনো আলমারি নয়, যেখানে যা ভালো লাগে না, তা তুলে বাইরে রেখে দেওয়া যায়। সব চিন্তার উত্তর খুঁজতে হয় না, সব চিন্তার সঙ্গে লড়তেও হয় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।