ক্ষুধার আগে কোনো পাঠই দাঁড়ায় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৩ মে, ২০২৬
“বিদ্যার অভাবে বাঁচা যায়, ভাতের অভাবে নয়”—বাক্যটা যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবতায় ততটাই অস্বস্তিকরভাবে ধারালো। এটাকে শুধু প্রবাদ হিসেবে নিলে আসল কথাটা হারিয়ে যায়। এখানে প্রশ্নটা শিক্ষার বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্নটা বেঁচে থাকার শর্ত নিয়ে।
মানুষ শেখে কেন—এই প্রশ্নে আমরা সাধারণত খুব পরিচ্ছন্ন উত্তর দিই: জ্ঞান, আত্মোন্নয়ন, সমাজ পরিবর্তন। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো অনেকটা পরে বসানো ব্যাখ্যার মতো শোনায়। শুরুটা সেখানে নয়। শুরুটা খুব সোজা: মানুষ আগে বাঁচে, তারপর শেখে। আর বেঁচে থাকাটাই যদি প্রতিদিন অনিশ্চিত হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষা আর লক্ষ্য থাকে না—থাকে শুধু ঠেকিয়ে রাখা কোনো সম্ভাবনা।
ক্ষুধা এখানে কোনো ধারণা নয়। এটা শরীরের ভেতরে চলতে থাকা এক ধরনের অবিরাম হস্তক্ষেপ। মন তখন এক জায়গায় থাকে না। অঙ্ক বোর্ডে থাকলেও মাথা থাকে পেটে। ক্লাসরুমে বসে থাকা একটা শিশু হয়তো বোঝে শিক্ষক কী বলছেন, কিন্তু সেই বোঝাটা ধরে রাখার মতো মানসিক ফাঁকা জায়গা তার নেই।
ধরা যাক, একটা শিশু সকালে স্কুলে এসেছে শুধু এক কাপ চা খেয়ে। টিফিনের সময় অন্যদের স্যান্ডউইচ খুলে খেতে দেখে সে হয়তো জানে না সামনে অঙ্কের ক্লাস আছে। সে শুধু অপেক্ষা করছে কখন ঘণ্টা বাজবে। এমন অবস্থায় “ভালো করে পড়ো”—এই কথাটা উপদেশের চেয়ে বেশি এক ধরনের অদৃশ্য চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা এই বাস্তবতাকে প্রায়ই ব্যক্তিগত দায় হিসেবে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু সমস্যা সেখানে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্যনিরাপত্তা যদি দুর্বল হয়, তাহলে শিক্ষার পুরো কাঠামো একটা অসম খেলার মাঠে পরিণত হয়। কেউ দৌড় শুরু করে খেয়ে, কেউ শুরু করে খালি পেটে। ফলাফল আগেই অনেকটা ঠিক হয়ে যায়।
এখানে একটা ভুল ধারণা কাজ করে—শিক্ষা নিজেই সমাধান। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো কিছু বলে। শিক্ষা অনেক সময় সমাধান না হয়ে ফলাফল হয়। আগে যদি শরীর আর জীবন একটু নিশ্চিত না থাকে, তাহলে শেখার জায়গাটা তৈরি হয় না। এটা কোনো নীতিকথা না, এটা অভিজ্ঞতার স্তরে দাঁড়ানো একটা সত্যি।
তবে এ থেকে সহজ সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না যে বিদ্যার গুরুত্ব কম। বরং উল্টোটা। শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘ সময় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু সেই শিক্ষার ভিত যদি টলমল করে, তাহলে পুরো কাঠামোও ভঙ্গুর হয়ে যায়—এটা ধীরে ধীরে দেখা যায়, হঠাৎ না।
ভবিষ্যৎ যখন ছোট হয়ে আসে
ক্ষুধার আরেকটা কাজ আছে, যেটা আমরা প্রায়ই ধরতে পারি না। এটা ভবিষ্যৎকে ছোট করে আনে। যখন আজই অনিশ্চিত, তখন দশ বছর পরের চিন্তা প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। তখন সিদ্ধান্তগুলো আর স্বপ্ন দ্বারা চালিত হয় না, চালিত হয় খুব তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন দিয়ে—আজ কীভাবে কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে, সেটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
এই জায়গায় “শিক্ষা নিলে জীবন বদলাবে”—এই ধরনের বাক্য অনেক সময় অসম্পূর্ণ শোনায়। কারণ জীবন যদি আগে থেকেই ন্যূনতম স্থিতি না পায়, তাহলে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগটাই সীমিত হয়ে পড়ে। এটা ব্যক্তির ইচ্ছার ব্যর্থতা না, এটা সুযোগের অসম বণ্টন।
আরেকটা দিক প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়—মর্যাদা। ক্ষুধা শুধু শরীরকে খালি করে না, মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাটাকেও ভাঙতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সে নিজেকে কেন্দ্রের বাইরে রাখতে শেখে। ক্লাসে বসে থেকেও সে নিজেকে অংশ মনে করে না। এই জায়গায় গিয়ে শেখা আরেকটু দূরে সরে যায়।
যেমন কিছু স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম চালু হওয়া এলাকায় দেখা গেছে, উপস্থিতি ও মনোযোগ দুটোই তুলনামূলকভাবে বাড়ে। কারণ চাপ কমলে মন নিজের জন্য জায়গা পায়। শেখা তখন বাধ্যতামূলক কাজ না হয়ে স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
এখান থেকেই একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন আসে—আমরা উন্নয়নকে কোন দিক থেকে শুরু করছি? শুধু পাঠ্যক্রম বাড়িয়ে, বা শুধু স্কুল খুলে, পুরো ছবিটা বদলায় না যদি নিচের ভিত্তিটা দুর্বল থাকে। আবার শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ালেও সমস্যা শেষ হয় না, যদি দক্ষতা তৈরির পথ বন্ধ থাকে।
শেষ পর্যন্ত এই বাক্যটা কোনো হতাশা না। এটা একটা সরাসরি মনে করিয়ে দেওয়া। উন্নয়নকে যতটা নীতি বা স্লোগান মনে হয়, বাস্তবে সেটা শুরু হয় খুব নিচু জায়গা থেকে—একটা স্থির পেট, একটা থমকে না থাকা দিন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।