উপেক্ষিত মধ্যম মেধাবীরা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২৬
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বহু বছর ধরে একটি নীরব বৈষম্য তৈরি করে এসেছে। নীরব—কারণ এ নিয়ে খুব কমই উচ্চস্বরে আলোচনা হয়। আর বৈষম্য—কারণ এর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বড় একটি অংশের ওপর, অথচ সেই অংশটি প্রায় অদৃশ্যই থেকে যায়। আমরা সাধারণত শিক্ষাব্যবস্থাকে দেখি দুই চরম প্রান্ত থেকে।
একদিকে ‘সুপারস্টার’ শিক্ষার্থীরা—যাদের নাম রেজাল্টশিটের শীর্ষে ঝলমল করে, যাদের নিয়ে গর্ব করা সহজ, যাদের ছবি স্কুল বা কলেজের দেয়ালে ঝোলে। অন্যদিকে ‘দুর্বল’ বা ‘ব্যর্থ’ বলে চিহ্নিত শিক্ষার্থীরা—যাদের জন্য সহানুভূতি তৈরি হয়, বাড়তি টিউশন, বিশেষ ক্লাস, কিংবা অভিভাবকের অতিরিক্ত নজর থাকে।
এই দুই প্রান্তই দৃশ্যমান। এই দুই প্রান্ত নিয়েই আমাদের নীতি, আলোচনার বিষয়।
কিন্তু এই দুইয়ের মাঝখানে থাকা বিশাল ভিড়টি—মধ্যম মেধাবীরা—ধীরে ধীরে চোখের আড়ালে চলে যায়। তারা পরীক্ষায় প্রথম হয় না, আবার ফেলও করে না। নিয়মিত ক্লাসে আসে, কাজ জমা দেয়, পরীক্ষায় বসে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়—সব ঠিকঠাকই চলছে। সম্ভবত এখানেই সমস্যার গভীরতা। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার চোখে তারা কেবল “চলছে”—আর আমরা ধরে নিই, চলাটুকুই যথেষ্ট। এরা কোনো হাইলাইট নয়, কোনো স্পটলাইটও নয়।
একজন মধ্যম মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন খুব বেশি নাটকীয় নয়। তার গল্পে বড় সাফল্যের শিরোনাম নেই, আবার বড় ব্যর্থতার দৃশ্যও নেই। কিন্তু এই নীরবতার মধ্যেই তার সংগ্রাম সবচেয়ে দীর্ঘ হয়। সে প্রশ্ন করে—আমি কি ঠিক পথে আছি? কোথায় আটকে যাচ্ছি?
—কিন্তু সেই প্রশ্নগুলোর জন্য কোনো নিশ্চিত ঠিকানা নেই।
আমার এক বন্ধু রবিনের কথা মনে পড়ে। সে চট্টগ্রামের একটি সরকারি কলেজ থেকে এসেছিল। স্কুলজীবন থেকেই তার ফলাফল প্রায় একই রকম—৭০ থেকে ৭৫-এর ভেতর। কখনো টপার নয়, আবার কখনো পিছিয়েও না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সে নিয়মিত ক্লাস করত, গ্রুপ প্রেজেন্টেশনে কথা বলত, লাইব্রেরিতে রাত কাটাত। কিন্তু ফলাফল? প্রায় সবসময় ৩.২–৩.৪-এর মধ্যে।
একদিন গভীর রাতে ফোনে বলেছিল,
“ভাই, আমি কি আসলে পারব?
সবাই হয় ভালো করছে, না হয় আলাদা করে সামলানো হচ্ছে। আমি শুধু… চলছি।”
ওই “শুধু” শব্দটার ভেতরে একটা ক্লান্তি ছিল। আমি সেদিন কোনো শক্ত উত্তর দিতে পারিনি। এখনও পারি না। রবিন এখন একটি ছোট অফিসে কাজ করছে। সে বলে, “আমার মতো অনেকেই আছে। আমরা টিকে আছি, কিন্তু উঠতে পারছি না।” কথাটা শুনলে মনে হয়—এটা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং একটি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা।
ধরা যায়, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী এই ‘মধ্যম’ জোনেই অবস্থান করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী ৩.০–৩.৫ GPA-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সংখ্যাগুলো নিয়ে বিতর্ক হতে পারে—আমি নিশ্চিত নই এগুলো কতটা নিখুঁত। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই অংশটাই সবচেয়ে কম আলো পায়। অসাধারণরা পায় বৃত্তি, প্ল্যাটফর্ম, পরিচিতি। দুর্বলরা পায় আলাদা সহায়তা। মাঝখানেরা?
তারা নিজেরাই পথ খোঁজে।
এই অবহেলা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি কাঠামোগত। শিক্ষকরা অনিচ্ছাকৃতভাবেই দুই প্রান্তে বেশি মনোযোগ দেন—কারণ টপারের সাফল্য চোখে পড়ে, আর দুর্বলের সমস্যাও স্পষ্ট। মধ্যমদের সংগ্রাম neither loud nor visible. বড় ক্লাসরুম, সীমিত সময়, ফলাফলকেন্দ্রিক মূল্যায়ন—সব মিলিয়ে এই গোষ্ঠীটি ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারাতে থাকে।
সমাধানের কথা বললেই আমরা কিছু শব্দ উচ্চারণ করি—নতুন প্রোগ্রাম, নতুন উদ্যোগ। কিন্তু আমার নিজের সন্দেহ আছে। সত্যিই কি শুধু নতুন প্রকল্পে সব সমাধান?
নাকি শিক্ষার দর্শনটাই নতুন করে ভাবা দরকার?
তবু কিছু দিক পরিষ্কার। পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধানের সুযোগ—এই জায়গাগুলোতে মধ্যম মেধাবীরা সুযোগ পেলে অনেক দূর যেতে পারে। তারা হয়তো ঝলমলে নয়, কিন্তু টেকসই। তারা ধীরে শেখে, কিন্তু স্থায়ীভাবে শেখে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাদের জন্য সেই জায়গাটা তৈরি করছি?
মধ্যম মেধাবীরা অদৃশ্য নয়, অক্ষমও নয়। তারা নীরবে সমাজের ভার বহন করে। প্রশাসন, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সবখানেই এই মধ্যমরাই নিয়মিত কাজের মূল ভরসা। রবিনদের মতো হাজারো মানুষ প্রতিদিন চেষ্টা করছে—শুধু একটু দিকনির্দেশনার অভাবে। এই উপেক্ষা যদি চলতেই থাকে, তবে সেটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; জাতীয় সম্ভাবনার অপচয়। হয়তো এখনই সময়, এই নীরব ভিড়টার দিকে নতুন করে তাকানোর।
#উপেক্ষিতমধ্যমমেধাবীরা #শিক্ষানীতি #শিক্ষাবৈষম্য #মধ্যমমেধাবীউন্নয়ন #ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #বাংলাশিক্ষা #মানবসম্পদউন্নয়ন #রবিনেরগল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।