ভাঙনের পরেও মূল্য থাকে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩ নভেম্বর ২০২৬
সকালে রান্নাঘরে গিয়ে দেখি, বাটিতে রাখা দুধটা নষ্ট হয়ে গেছে। গন্ধ বদলে গেছে, স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। প্রথমে মনে হলো ফেলে দিই। এমন দুধ রেখে কী হবে? কিন্তু বাটিটা সরাতে গিয়েও থেমে গেলাম। মনে হলো, দুধটা দিয়ে দই করা যায় কি না দেখা যেতে পারে।
দুধ থেকে দই হলো। পরে সেই দই থেকে মাখন, আর মাখন থেকে ঘি তৈরি করা সম্ভব। যে দুধটাকে একসময় ব্যবহার অনুপযোগী মনে হচ্ছিল, প্রক্রিয়ার পরিবর্তনে সেটিই অন্য রূপ নিতে পারে।
রান্নাঘরের এই সামান্য ঘটনাটি আমাকে মানুষের জীবনের কথা মনে করিয়ে দিল। আমরা কোনো কিছু হারালে কিংবা কোনো ভুল করলে খুব দ্রুত নিজেদের শেষ হয়ে যাওয়া মানুষ বলে ভাবতে শুরু করি। অথচ একটি অবস্থার পরিবর্তন মানেই সবকিছুর সমাপ্তি নয়।
জীবনে এমন কিছু সিদ্ধান্ত থাকে, যেগুলো নেওয়ার সময় আমরা বুঝতে পারি না সামনে কী অপেক্ষা করছে। কাউকে বিশ্বাস করে ঠকে যাই, ব্যবসায় টাকা হারাই, ভুল মানুষকে আপন করে নিই, কিংবা আবেগের বশে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিই, যার মাশুল অনেক দিন ধরে দিতে হয়। পরে যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়, সেদিন একটু ভেবে কাজ করলে হয়তো এমন হতো না।
এই আফসোসের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। যে ঘটনাটি অতীতে ঘটেছে, সেটিকে আমরা বারবার বর্তমানের মধ্যে ফিরিয়ে আনি। নিজের সঙ্গে নিজের তর্ক চলে। কেন এমন করলাম, কেন বুঝতে পারলাম না, কেন অন্যের কথায় সিদ্ধান্ত নিলাম? প্রশ্নের শেষ থাকে না। অথচ সময় আর আগের জায়গায় ফেরে না।
আমাদের সমাজেও ভুলের প্রতি সহনশীলতা খুব কম। কেউ একবার ব্যবসায় লোকসান করলে তার পরবর্তী উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ করলে তার আগের ভালো ফলাফলগুলোও যেন গুরুত্ব হারায়। সংসারে কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হলে সেই ভুলের কথা বছরের পর বছর মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
অর্থাৎ আমরা মানুষের বর্তমান অবস্থার চেয়ে তার অতীতের ব্যর্থতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত।
এখানে একটা বিষয় লক্ষ করার মতো। যে মানুষটি জীবনে কখনো বড় কোনো ভুল করেননি, তাঁর অভিজ্ঞতার পরিধিও হয়তো সীমিত। কারণ অভিজ্ঞতা শুধু ভালো সিদ্ধান্ত থেকে আসে না। কখনো ভুল সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করেও মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধি তৈরি করে। আগে যেখানে সহজেই কাউকে বিশ্বাস করতেন, পরে সেখানে একটু সময় নিয়ে ভাবেন। আগে যেখানে রাগের মাথায় উত্তর দিতেন, পরে কিছুক্ষণ নীরব থাকতে শেখেন। আগে যেখানে সামান্য অপমানেই সম্পর্ক ভেঙে ফেলতেন, পরে বুঝতে পারেন কোন সম্পর্ক ধরে রাখা দরকার, আর কোনটি থেকে সরে আসা ভালো।
তবে ভুল করলেই মানুষ মূল্যবান হয়ে যায়, এমন নয়। একই ভুল বারবার করে তার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিলে অভিজ্ঞতা তৈরি হয় না। বরং ভুলের কারণ খুঁজে বের করা, নিজের দায় স্বীকার করা এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়েই অভিজ্ঞতার মূল্য তৈরি হয়।
একটি সম্পর্ক ভেঙে গেলে মানুষ অনেক কিছু হারায়। কখনো সময়, কখনো বিশ্বাস, কখনো নিজের আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সেই ভাঙন থেকে যদি সে বুঝতে পারে কোথায় নিজের সীমারেখা রাখা দরকার ছিল, কোন আচরণকে অবহেলা করা উচিত হয়নি, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে কাজে লাগতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি কষ্টের জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। কিছু কষ্ট অপ্রয়োজনীয়, কিছু অন্যায়ের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু যা ঘটে গেছে, তার মধ্যে নিজের জন্য কোনো শিক্ষা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়।
আমরা অনেক সময় অন্যের সফলতা দেখে তার বর্তমান অবস্থাটুকুই দেখি। পেছনের ভুল, অপমান, লোকসান কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার দিনগুলো দেখি না। আবার নিজের জীবনের ব্যর্থতাগুলো এত কাছ থেকে দেখি যে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটুকুও চোখে পড়ে না।
হয়তো এ কারণেই কেউ কেউ একটি ব্যর্থতার পর আর চেষ্টা করতে সাহস পান না। মনে করেন, আবার যদি একই ঘটনা ঘটে? আবার যদি সবাই হাসে? আবার যদি নিজের কাছে নিজেকেই ছোট মনে হয়?
কিন্তু প্রথমবারের অভিজ্ঞতা আর দ্বিতীয়বারের অভিজ্ঞতা এক নয়। মাঝখানে মানুষ কিছু শেখে, কিছু বোঝে, কিছু ভুল চিনতে পারে। আগের মতো একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও এবার তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন বদলে যেতে পারে।
দুধের বাটিটার দিকে আবার তাকালে বিষয়টি আরও সহজ মনে হয়। দুধটি আগের অবস্থায় ফিরবে না। তার স্বাদ, গন্ধ, গঠন বদলে গেছে। কিন্তু পরিবর্তিত অবস্থার মধ্যেও অন্য একটি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। মানুষের জীবনেও অতীতের ভুল মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবে সেই ভুলকে সারাজীবনের পরিচয় বানিয়ে রাখারও কোনো প্রয়োজন নেই।
একটা সময় পর নিজের কাছেই প্রশ্ন করতে হয়, যে ভুলটি নিয়ে এত দিন আফসোস করছি, সেখান থেকে আসলে কী শিখেছি? যে ক্ষতিটিকে জীবনের শেষ বলে মনে হয়েছিল, সেটি কি আমাকে নিজের কোনো দুর্বলতা চিনতে সাহায্য করেছে? যে মানুষটি চলে গেছেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে কি নিজের জীবনকে নতুন করে চিনতে পেরেছি?
সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। কিছু অভিজ্ঞতার অর্থ বুঝতে অনেক সময় লাগে।
সকালে যে বাটির দুধটাকে ফেলে দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল, বিকেলে সেটিই হয়তো পরিবারের খাবারের টেবিলে অন্য রূপে জায়গা পেল। দুধ আর আগের মতো নেই, কিন্তু তার ব্যবহার শেষ হয়ে যায়নি।
মানুষের জীবনেও কিছু ভাঙন এমনই। আগের অবস্থায় ফেরা যায় না, কিন্তু সেখানেই থেমে থাকতে হয় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।