নিশির দিনগুলো
গল্প-১০ : নতুন সকাল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
সব হারিয়েও একদিন সে বুঝল, জীবন এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
অভিক চলে যাওয়ার পর অনেক দিন পর্যন্ত নিশির মনে হতো, তার জীবনটা যেন কোথাও থেমে গেছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠত, অফিসে যেত, বাড়ি ফিরত, রান্না করত। সবই করত, কিন্তু শুধু দায়িত্ব থেকে। নিজের জন্য আলাদা করে কোনো স্বপ্ন ছিল না।
একদিন ছুটির সকালে বারান্দায় বসে একটা পুরোনো ডায়েরি পড়ছিল। ডায়েরির ভেতরে অভিকের হাতের লেখা।
"নিশি, তুমি একটা কাজ খুব ভালো পারো। মানুষকে ভরসা দিতে পারো। কোনোদিন নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না।"
লাইন দুটো পড়ে সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। কত বছর হয়ে গেছে, তবু কথাগুলো যেন একেবারে নতুন লাগছিল।
সেদিন অফিসে গিয়ে শুনল, হিসাব বিভাগের পাশাপাশি ছোট একটা নতুন প্রকল্প শুরু হবে। অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে চাইলে আবেদন করা যাবে।
আগের নিশি হলে হয়তো চুপ করে থাকত। ভাবত, এত ঝামেলা নিয়ে কী হবে।
কিন্তু এবার সে আবেদন করল।
কয়েকজন বলেছিল,
"এত ঝামেলা নিয়ে কী হবে?"
নিশি শুধু হেসেছিল। অনেক দিন পর নিজের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা আর বদলাতে চায়নি।
কয়েক মাসের মধ্যেই তার কাজের প্রশংসা শুরু হলো। বেতনটাও একটু বাড়ল।
বাড়ি ফিরে খবরটা বলতেই মিশি হাততালি দিয়ে উঠল,
"আমি জানতাম, তুমি পারবে।"
মেঘ হেসে বলল,
"এবার কিন্তু নিজের জন্যও কিছু কিনবে।"
নিশি হেসে বলল,
"আগে তোদেরটা।"
মেঘ মাথা নেড়ে বলল,
"এই কথাটাই তুমি সব সময় বলো। এবার একটু নিজের কথাও ভাবো।"
কথাটা শুনে নিশি হেসেছিল। কিন্তু সেদিন সত্যিই নিজের জন্য একটা শাড়ি কিনেছিল। খুব দামি নয়। হালকা রঙের, নরম সুতির একটা শাড়ি।
তবু শাড়িটা হাতে নিয়ে মনে হচ্ছিল, অনেক বছর পর নিজেকে একটা ছোট্ট উপহার দিল।
ঈদের দিন সেই শাড়িটাই পরেছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই মানুষটাকে সে অনেক দিন দেখেনি। চোখের নিচে ক্লান্তির দাগ আছে। চুলে অল্প সাদা রংও ধরেছে। তবু ভেতরে কোথাও একটা আলো আবার জ্বলে উঠেছে।
রাতে খাওয়ার পর তিনজন বারান্দায় বসেছিল। হালকা বাতাস বইছিল।
মিশি হঠাৎ বলল,
"মা, বাবা থাকলে আজ তোমাকে দেখে খুব খুশি হতো।"
নিশি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া সাহসটা থেকে যায়।
অভিক ফিরে আসবে না। এই সত্যিটা সে মেনে নিয়েছে। কিন্তু সেই সত্যি মেনে নেওয়ার মানে জীবন থেমে যাওয়া নয়।
জীবন কখনো কখনো খুব ধীরে আবার শুরু হয়।
একটা ছোট সিদ্ধান্ত থেকে। একটা নতুন কাজ থেকে। একটা নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পাওয়া থেকে।
আর তারপর একদিন সত্যিই মনে হয়,
সব শেষ হয়ে যায়নি।
নতুন একটা সকাল এখনও অপেক্ষা করে আছে।
-----------------------সমাপ্ত----------------------
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।