যখন রাত জেগে থাকে মানুষের ভেতরে
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী লেখা | ০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
তুমি কি কখনো লক্ষ্য করেছ, কোনো মানুষ হঠাৎ চুপ হয়ে যায়?
যে মানুষটা একসময় হাসতে হাসতে গল্প করত, সে এখন চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও মনে হয় দূরের কোনো ছায়া। তার ভেতরে কী ঝড় চলছে, আমরা জানি না। আমরা শুধু বলি, “ও একটু চুপচাপ হয়ে গেছে।”
কিন্তু ও চুপচাপ হয়নি। ওর ভেতরে একটা যুদ্ধ চলছে। প্রতি রাতে। প্রতি স্বপ্নে।
যে দৃশ্যটা সে একবার দেখেছিল—একটা লাশের ওপর মায়ের কান্না, একটা বোমার শব্দ, একটা ছুরির ঝিলিক, একটা শিশুর চিৎকার—সেই দৃশ্যটা আজও তার চোখের পাতায় আটকে আছে। সে চোখ বন্ধ করলেই সেই দৃশ্য ফিরে আসে। আবার। আবার। আবার।
এই যন্ত্রণার নাম পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার।
কিন্তু নাম দিয়ে কী হবে? নাম তো ব্যথা কমায় না।
আমি একজন মেয়েকে চিনি।
ধর্ষণের শিকার। সে আজও বেঁচে আছে। কিন্তু তার বেঁচে থাকাটা যেন একটা শাস্তি। রাত হলেই সে চিৎকার করে ওঠে। তার মা জড়িয়ে ধরে কাঁদে। বাবা বাইরে গিয়ে সিগারেট খায়।
ভাই বলে, “আর কতদিন এমন করবি? ভুলে যা।”
ভুলে যা?
যে শরীরে আজও সেই হাতের ছোঁয়া লেগে আছে, সেই শরীর কীভাবে ভুলবে?
আমরা বলি, “সময় সব ভুলিয়ে দেয়।”
কিন্তু কিছু ক্ষত সময়ের ওপর দিয়ে আরও গভীর হয়।
আমি আরেকজনকে চিনি।
যুদ্ধ থেকে ফেরত সৈনিক। তার পায়ে গুলির দাগ নেই, কিন্তু মনের ভেতর গুলি লেগে আছে। বাজারে হঠাৎ একটা বাজি ফুটলে সে মাটিতে শুয়ে পড়ে। তার স্ত্রী বলে, “তুমি তো দেশের জন্য লড়েছ।”
সে চুপ করে থাকে। কারণ সে জানে, দেশ বেঁচে গেছে। কিন্তু সে বাঁচেনি।
আমরা যখন বলি “পাগল হয়ে গেছে”, তখন আসলে কী বলি?
আমরা বলি—তোমার ব্যথা আমাদের অস্বস্তিকর লাগছে। তুমি চুপ করো।
কিন্তু ওরা চুপ করতে পারে না।
কারণ তাদের ভেতরে একটা শব্দ চলছে। সারাক্ষণ।
যে শব্দটা আমরা শুনি না।
বাংলাদেশে মানসিক রোগ নিয়ে কথা বলা এখনো লজ্জার।
যেন মন ভাঙলে শরীরের মতো প্লাস্টার লাগানো যায় না, তাই সেটা লুকিয়ে রাখতে হবে।
ফলে একজন মা তার ছেলেকে নিয়ে ঘুরছে কবিরাজ থেকে কবিরাজ। কারণ “এটা তো জিনের আছর।”
আর সেই ছেলে প্রতি রাতে নিজের গলায় দড়ি দেওয়ার কথা ভাবে।
আমরা যদি শুধু একবার জিজ্ঞেস করতাম,
“কী হয়েছে? বলো। আমি শুনব।”
হয়তো অনেক জীবন বদলে যেত।
একটা ছোট্ট শব্দই যথেষ্ট—
“আমি তোর পাশে আছি।”
কারণ যারা পিটিএসডিতে ভুগছে, তারা আসলে একা থাকতে ভয় পায়।
তারা ভয় পায়—আবার সেই অন্ধকার ফিরে আসবে। আর এবার কেউ থাকবে না।
তাই আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করি।
কেউ যদি হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, আমরা তাকে “পাগল” বলব না।
আমরা তার হাতটা ধরব।
আমরা বলব,
“তোর ভেতরে যা ঝড় উঠেছে, আমি তার সাক্ষী থাকতে চাই।”
কারণ মানুষ মরে না শুধু গুলি খেয়ে।
মানুষ মরে যখন তার ব্যথাকে কেউ বিশ্বাস করে না।
#যখন_রাত_জেগে_থাকে #পিটিএসডি
#মনের_ক্ষত #একা_নয়_কেউ
#আমি_শুনছি #মানসিক_স্বাস্থ্য_মানে_বেঁচে_থাকা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।