জুতা খুলে রাখি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী লেখা | ২ নভেম্বর ২০২৬
গত শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে নীলক্ষেতের একটি পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এক ব্যক্তি দোকানদারের সঙ্গে দাম নিয়ে তর্ক করছিলেন। তাঁর মাথায় সাদা টুপি। হাতে কয়েকটি বই।
দোকানদার একটি বইয়ের দাম বিশ টাকা বেশি চেয়েছেন, এমন অভিযোগ তাঁর। একপর্যায়ে তিনি বললেন, ‘আপনি জুমার নামাজ পড়েন না? এভাবে মানুষ ঠকান কী করে?’
দোকানদারও চুপ করে থাকলেন না। বললেন, ‘নামাজ পড়েছি বলেই তো আপনার সঙ্গে হিসাব করে কথা বলছি। বইয়ের দাম বেশি মনে হলে না নিলেই পারেন। কিন্তু আমাকে চোর বলছেন কেন?’
আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। বইটির প্রকৃত দাম কত, তা জানতাম না। কে ঠিক, কে ভুল, সেটাও নিশ্চিত হওয়ার উপায় ছিল না। কিন্তু দুজনের কথার মধ্যে একটি বিষয় বারবার মনে হচ্ছিল। ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে অন্যের সততা যাচাই করার অধিকার আমরা এত সহজে কোথায় পেলাম?
আমাদের সমস্যা বোধ হয় এখানেই। আমরা অনেক সময় ধর্মকে নিজের আচরণ শুদ্ধ করার চেয়ে অন্যের আচরণ বিচার করার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করি।
অথচ ধর্মালয়ে যাওয়ার একটি উদ্দেশ্য তো নিজের ভেতরের ভুলগুলো চিনতে শেখা। জুমার নামাজে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রার্থনা করেন, তখন সেখানে ধনী-গরিবের ব্যবধান থাকার কথা নয়। কিন্তু নামাজ শেষে সেই মানুষটিই যদি রিকশায় উঠে ভাড়া নিয়ে চালকের সঙ্গে অকারণে দুর্ব্যবহার করেন, তাহলে তাঁর প্রার্থনার শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনে কতটা পৌঁছাল, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এখানে উপাসনালয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বরং উপাসনালয়ের প্রয়োজন আছে বলেই মানুষ সেখানে ফিরে ফিরে যায়। মানুষ ভুলে যায়, নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখে, রাগের মাথায় অন্যায় করে। প্রার্থনা তাকে থামতে, ভাবতে এবং নিজের ভুল সংশোধন করতে মনে করিয়ে দেয়।
কিন্তু মনে করিয়ে দেওয়ার পরও যদি আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে শুধু উপস্থিতির হিসাব দিয়ে ধার্মিকতার বিচার করা কঠিন।
এই কথার বাইরে আমিও নই। কখনো কখনো নিজের কাজের তাড়া, বিরক্তি কিংবা প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার কারণে অন্যের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছি, পরে মনে হয়েছে কথাটা এভাবে না বললেও পারতাম। তখন নিজের কাছেই প্রশ্ন জেগেছে, যে সংযমের কথা অন্যকে বলি, নিজের বেলায় সেটি কতটা মানি?
মানুষের এই দ্বন্দ্ব অস্বীকার করে লাভ নেই। ধর্মীয় পরিচয় থাকা সত্ত্বেও আমরা ভুল করি। কিন্তু ভুল করার পর সেটিকে স্বীকার না করে ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাওয়াটাই আরও বড় সমস্যা।
একজন মানুষ নিয়মিত নামাজ পড়েন, অথচ কর্মচারীর বেতন আটকে রাখেন। তিনি হয়তো মনে করেন, ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু যে কর্মচারী মাস শেষে বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না, তাঁর কাছে সেই নামাজের পরিচয়ের চেয়ে পাওনা টাকাটাই বেশি জরুরি। একইভাবে, অন্যের অধিকার নষ্ট করে দান করলে দানের প্রচার হতে পারে, কিন্তু অন্যায়ের দায় তাতে মুছে যায় না।
ধার্মিক হওয়ার অর্থ এই নয় যে মানুষ কখনো ভুল করবে না। বরং ভুল বুঝতে পারলে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসার সাহসও ধার্মিকতার অংশ।
আমার কাছে তাই কথাটির অর্থ দাঁড়ায়, অধার্মিক ধর্মালয়ে ঢুকলেই ধার্মিক হয়ে যায় না; আবার ধার্মিক মানুষ যেখানেই থাকুন, তাঁর আচরণে ধর্মের শিক্ষা প্রকাশ পেতে পারে। তাঁর কর্মস্থলে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তায় কিংবা অপরিচিত কোনো মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে।
সেদিন নীলক্ষেতের সেই বইয়ের দোকানের সামনে শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল, তা আর জানা হয়নি। আমি চলে আসার সময় লোকটি বইগুলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দোকানদারও নিজের কাউন্টারে ফিরে গিয়েছিলেন।
শুধু একটা কথা মনে রয়ে গেছে। আমরা ধর্মালয়ে প্রবেশের আগে জুতা খুলে রাখি, কিন্তু বেরিয়ে এসে অনেক সময় অহংকার, রাগ আর অন্যায়ের অভ্যাসগুলো খুলে রাখতে ভুলে যাই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।