জীবনের দাম কত?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবরটা পড়ার পর থেকে একটা প্রশ্ন মাথা থেকে যাচ্ছে না—একটা আইফোনের ঘটনায় একটা শিশুকে প্রাণ হারাতে হলো?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মায়ের আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সে বাধা দেওয়ার পর তাকে মারধর করা হয় বলেও পুলিশ জানিয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার পুরো সত্যটা অবশ্য তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই পরিষ্কার হবে।
এই খবরটা মাথায় থাকার মধ্যেই খুলনা থেকে আরেকটি মৃত্যুর খবর এলো। নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. আজমুল হোসেন। মেসে এক প্লেট ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
তিনি ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছেন, নাকি তাঁকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল—সেটি এখনো তদন্তের বিষয়। পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের সময় টাকা দাবি করার অভিযোগও করা হয়েছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে।
ঘটনা দুটো আলাদা। একজন শিশু, অন্যজন তরুণ। একজনের ঘটনায় আইফোনের কথা এসেছে, অন্যটির সূত্রপাত এক প্লেট ভাত নিয়ে বিরোধ থেকে।
তবু খবর দুটো পড়ার পর আমার মাথায় একই প্রশ্ন ফিরে আসছে।
একটা জিনিস, কিছু টাকা কিংবা সামান্য একটা ঝামেলা—কোন পর্যায়ে এসে মানুষের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে যায়?
আইফোনের দাম আছে। তার বাজারমূল্য আছে। হারিয়ে গেলে কষ্ট করে হলেও আরেকটা কেনা সম্ভব। অপ্রতিমকে কিন্তু আর ফেরত পাওয়া যাবে না।
এই কথাটা খুব সহজ। তারপরও এমন ঘটনা ঘটলে বারবার বলতে ইচ্ছে করে।
আজমুলের ঘটনাটাও তাই। এক প্লেট ভাত নিয়ে কথা কাটাকাটি হতে পারে। মেসে মতের অমিল হবে, রাগারাগিও হতে পারে। কিন্তু একটা ঝগড়ার শেষ যদি একজন মানুষের মৃত্যুতে হয়, তখন ভাতটা আর আসল বিষয় থাকে না। তখন ভাবতে হয়, রাগের মুহূর্তে মানুষ কেন নিজেকে থামাতে পারে না?
কথা থেকে কথা বাড়ে। কেউ অপমানিত হয়, পাল্টা কথা বলে। পুরোনো ক্ষোভও হয়তো এসে মিশে যায়। তারপর কারও মুখ থেকে বের হয়, ‘ওকে একটা শিক্ষা দিতে হবে।’
এই কথাটা আমি ভয় পাই।
‘শিক্ষা’ দেওয়ার নামে হাত তোলার শুরুটা অনেক সময় খুব ছোট হয়। কিন্তু মানুষ একবার নিজের হাতে শাস্তি দেওয়াকে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করলে সীমাটা কোথায়, সে আর বুঝতে পারে না। সন্দেহকে সত্যি ধরে নেওয়া হয়, রাগকে ন্যায্য মনে হয়। কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে উত্তেজিত হলে ব্যাপারটা আরও খারাপ দিকে যেতে পারে।
অন্যায় হয়েছে মনে হলে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ আছে। অভিযোগ করা যায়, কথা বলা যায়, আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। কিন্তু নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করলে আর বিষয়টা শুধু ‘রাগের মুহূর্ত’ থাকে না।
এই দুই ঘটনা আমাকে আরেকটা কথাও ভাবিয়েছে।
আমরা জিনিসের দাম বুঝি। ফোনের দাম কত, টাকা কত, এক প্লেট খাবারের দাম কত—এসব নিয়ে হিসাব করতে আমাদের অসুবিধা হয় না। কিন্তু কখনো কখনো সেই হিসাবের মধ্যে মানুষটাই যেন হারিয়ে যায়।
ফোন হারালে নতুন ফোন কেনা যায়। টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। কিন্তু একজন মানুষ হারিয়ে গেলে তাঁর জায়গায় আর কাউকে বসানো যায় না।
অপ্রতিমের বয়স ছিল মাত্র ১৩। তাঁর সামনে কী ছিল, সেটা আমরা জানি না। জানার সুযোগও আর হলো না। আজমুল ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তাঁর জীবনও সবে এগোতে শুরু করেছিল।
তাঁরা ভবিষ্যতে কী হতেন, সেটা নিয়ে অনুমান করার দরকার নেই। বড় কিছু হতেন কি না, সেটাও নয়। একজন মানুষের বেঁচে থাকার মূল্য তার ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল হতে পারত, তার ওপর নির্ভর করে না।
অপ্রতিমের পরিবার এখন কীভাবে দিন কাটাচ্ছে, আমরা পুরোটা জানি না। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ছেলেটি আর বাড়ি ফিরবে না। সেই বাস্তবতার সামনে আইফোনের প্রসঙ্গটাই একসময় খুব ছোট হয়ে যায়।
আজমুলের পরিবারও হয়তো এক প্লেট ভাতকে আর সাধারণ একটা মেসের ঘটনার মতো করে দেখতে পারবে না। ঘটনাটি তাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে, যেটা আর আলাদা করা সম্ভব নয়।
মৃত্যুর খবর একদিন পুরোনো হয়ে যায়। পত্রিকায় নতুন খবর আসে, মানুষ অন্য বিষয়ে কথা বলে। কিন্তু পরিবারের কাছে একজনের অনুপস্থিতি সেভাবে পুরোনো হয় না। ঘরে ঢুকতে গিয়ে, ফোন হাতে নিতে গিয়ে, পরিচিত কোনো শব্দ শুনে—হঠাৎ মানুষটার কথা মনে পড়ে যায়।
এই জায়গাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়।
একটি ঘটনার শুরুতে হয়তো ছিল একটি ফোন। আরেকটির শুরুতে এক প্লেট ভাত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হারিয়েছে মানুষ।
সেখানেই আমার প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে—জীবনের দাম কত?
আইফোনের দাম জানা যায়। এক প্লেট ভাতের দামও জানা যায়। হারানো টাকা হয়তো একদিন ফেরত আসে।
একজন মানুষের জীবনের দাম কোনো দোকানের তালিকায় লেখা থাকে না।
আর তাই এই হিসাবটা টাকার অঙ্কে মেলে না।
মানুষের জীবনের কোনো দাম নেই বলে নয়; বরং তার মূল্য এত বেশি যে কোনো দাম দিয়ে সেটি মাপা যায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।