মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ডিসেম্বর ২০, ২০২৫
কানের পেছন দিয়ে ঢুকে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া একটি গুলি—এটাকে কি সত্যিই “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলা যায়?
সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটা আজ আর আবেগের নয়, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার। ডিসেম্বরের শীতল বাতাসে যে রক্তের দাগ আমরা দেখছি, তাকে “বিচ্ছিন্ন” বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানে ন্যায়বিচারের বুকের ওপর আঘাত করা। ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়। এটি ছিল সুপরিকল্পিত, নির্মম এবং আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার নগ্ন দলিল।
প্রথমেই সিইসি প্রধানের মন্তব্যের দিকে তাকাতে হয়। এত স্পষ্ট আলামত, এত নৃশংসতা—তারপরও কীভাবে কেউ এটাকে “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলে চালিয়ে দিতে পারেন?
রাষ্ট্র যদি শব্দের আড়ালে সত্য লুকাতে চায়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ যখন ভাষা সত্যকে ঢেকে দেয়, তখন অস্ত্র আর গোপন থাকে না—সে প্রকাশ্যেই কথা বলে।
ডক্টর ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে প্রশ্ন আরও সরাসরি। কেন হাদিকে যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়া গেল না?
কেন একজন অস্ত্র মামলার আসামি জামিন পেয়ে আবারও এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সুযোগ পেল?
আইন কি শুধু নথির ভেতরে বন্দি কিছু শব্দ?
নাকি নাগরিকের জীবন তার চেয়েও তুচ্ছ?
এটা কোনো অনুমান নয়—এটা রাষ্ট্রের অবহেলার স্পষ্ট বাস্তবতা।
ওসমান হাদি ছিলেন মাত্র ৩২ বছরের এক তরুণ, যিনি স্বাধীনতা আর ন্যায়ের সন্ধানে ছিলেন। তিনি কোনো দলের ছায়ায় দাঁড়াননি। কোনো রাজনৈতিক লেবেল নিজের গায়ে লাগাতে রাজি হননি। আর ঠিক এই কারণেই তিনি ক্ষমতার কাছে হুমকি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েম করার স্বপ্ন দেখতেন—যেখানে আইন ক্ষমতার অধীন নয়, বরং ক্ষমতাই আইনের কাছে জবাবদিহি করবে। এই স্বপ্নই তাকে আলাদা করেছে, আর আলাদা হওয়াটাই এই সমাজে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি—এটাই আমাদের নির্মম অভিজ্ঞতা।
হাদির কথাগুলো আজ ইতিহাসের পাতায় নয়, আমাদের বিবেকের গভীরে গেঁথে আছে।
প্রধান উপদেষ্টাকে তিনি নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, “আপনার বয়স হয়েছে—মরার আগে অন্তত অন্যায়কারীদের নাম প্রকাশ করে যান।” এমন কথা বলার সাহস কজনের থাকে?
এই সাহসই তাকে টার্গেটে পরিণত করেছে। কারণ এখানে সমস্যা কথা বলা নয়—সমস্যা সত্য কথা বলা।
তার স্বপ্ন ছিল বড়। সংসদ সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার মতো উচ্চ লক্ষ্য—এগুলো কোনো ফাঁপা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং দায়িত্ববোধের প্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবর্তন বাইরে থেকে নয়—ভেতর থেকেই আসে। সেই বিশ্বাসই তাকে সামনে ঠেলে দিয়েছিল।
নির্বাচনী প্রচারের সময় তার ওপর ময়লা পানি ছোড়া হয়েছিল। তিনি ক্ষুব্ধ হননি। শান্ত গলায় বলেছিলেন, “ছোড়েন, আর কত ছোড়বেন?”
এই একটি বাক্যের ভেতর ছিল ধৈর্য, বিনয় আর গভীর আত্মবিশ্বাস—যা শক্তির নয়, নৈতিকতার ভাষায় কথা বলে। এই ধৈর্যই তাকে ক্ষমতার চোখে ভয়ংকর করে তুলেছিল।
এটি কোনো একক ঘটনা নয়—এটি একটি ধারাবাহিকতা। আবরার ফাহাদ, তেজগাঁও কলেজের সাকিব, এনসিপি নেত্রী রুমি—নাম আলাদা, কিন্তু গল্প এক। সরকার বদলায়, মুখ বদলায়; সহিংসতা থেকে যায়। তাই প্রশ্ন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, প্রশ্নটা পুরো ব্যবস্থাকে ঘিরে।
হুমকির রাজনীতি এখানেই শেষ হয়নি। হাদির চিকিৎসকের বাসায় কাফনের কাপড় পাঠানো হয়েছে। এটি কেবল ভয় দেখানো নয়—এটি আইনের প্রকাশ্য অবমাননা।
মৃত্যুর আগে হাদি নিজেই হাসনাত আব্দুল্লাহর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আজ সেই শঙ্কা আর আশঙ্কা নয়—এটা সতর্কবার্তা।
আমরা এখানে কাঁদতে আসিনি।
আমরা ন্যায়ের দাবি নিয়ে এসেছি।
সাত দিন ধরে সরকারের পদক্ষেপ দেখার অপেক্ষায় আছি।
উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্র চলে না; ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
শান্তিতে নোবেলজয়ী এবং প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ডক্টর ইউনূসের কাছে স্পষ্ট দাবি—খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করুন, সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করুন। আইন উপদেষ্টার উদ্বেগ তখনই অর্থবহ হবে, যখন খুনিরা জামিন পাবে না।
এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে জনগণের আস্থা ভেঙে পড়বে। আস্থা হারালে রাষ্ট্র টিকে থাকে না—শুধু কংক্রিটের দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকে।
হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। ইনসাফের লড়াই থামে না; থামলে রাষ্ট্রই অপরাধী হয়ে যায়।
আপনি যদি বিশ্বাস করেন—কণ্ঠ কখনো অপরাধ হতে পারে না—তাহলে এখনই শেয়ার করুন, প্রশ্ন তুলুন, নীরবতা ভাঙুন।
#কণ্ঠ_যখন_অপরাধ
#ওসমান_হাদি
#ইনসাফের_রাষ্ট্র
#বাকস্বাধীনতা
#ন্যায়বিচার_এখনই
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।