সফলতার মুখোশ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী সামাজিক প্রবন্ধ
১৩ জুলাই, ২০২৬
একটা সময় ছিল, দেখা হলে মানুষ জিজ্ঞেস করত, "কেমন আছ?" এখন প্রশ্নটা পাল্টে গেছে। "নতুন কী কিনলে?", "কোথায় ঘুরতে গেলে?", "কোন গাড়ি চালাও?" কিংবা "নিজের ফ্ল্যাট হয়েছে?"—এই কথাগুলো শুনতে স্বাভাবিক। কিন্তু কখন যেন এগুলোই মানুষের মূল্য মাপার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
আজকাল মনে হয়, ভালো থাকার চেয়ে ‘ভালো আছি’—এটা দেখাতেই আমরা বেশি ব্যস্ত।
এর পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায় কম নয়। ঘুম ভাঙতেই চোখে পড়ে অন্যের সাজানো জীবন। কেউ সমুদ্রের পাড়ে, কেউ বিদেশের শহরে, কেউ নতুন গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে, কেউ দামি রেস্টুরেন্টের টেবিলে। দেখতে দেখতে মনে হয়, সবাই দিব্যি আছে। শুধু আমার জীবনটাই যেন থেমে আছে।
অথচ আমরা একটা সহজ সত্য ভুলে যাই। কেউই তার পুরো জীবন ফেসবুকের দেয়ালে টাঙায় না। সেখানে হাসির ছবিটা থাকে, বিনিদ্র রাতটা থাকে না। নতুন গাড়ির ছবি থাকে, মাসে মাসে কিস্তির চাপটা থাকে না। বিদেশ ভ্রমণের ছবি থাকে, সেই খরচ জোগাতে কতটা হিসাব কষতে হয়েছে, সেই গল্পটা থাকে না।
তবু আমরা ওই ছবির সঙ্গে নিজের রক্ত-মাংসের জীবন মিলিয়ে দেখি। আর সেখান থেকেই শুরু হয় অকারণ অশান্তি।
এখন এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের জীবন বাইরে থেকে যতটা ঝকঝকে, ভেতরে ততটাই ভারী। ঋণ করে ফোন কেনা, ধার করে বিয়ে বা ভ্রমণ, কিস্তিতে এমন জিনিস কেনা যা এই মুহূর্তে না হলেও চলত। কেন? কারণ চারপাশে একটা অদৃশ্য চাপ—লোকে কী ভাববে?
ধীরে ধীরে আমরা এমন এক সমাজে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি, যেখানে নিজের প্রয়োজনের আগে অন্যের চোখে কেমন দেখাচ্ছি, সেটাই বড় হয়ে উঠছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—সফলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?
অনেক টাকা থাকলেই কি মানুষ সফল? যদি সেই মানুষটা রাতে দু-চোখের পাতা এক করতে না পারে, পরিবারের সঙ্গে বসে দুটো কথা বলার সময় না পায়, নিজের সন্তান কখন বড় হয়ে গেল টেরই না পায়—তবে সেই সাফল্যের দাম কতটুকু?
আবার এমন মানুষও আছেন, যাদের আয় আহামরি নয়। কিন্তু ঘরে শান্তি আছে। মাস শেষে পাহাড় সমান সঞ্চয় না থাকলেও কারও দুয়ারে হাত পাততে হয় না। রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। তাদের কি আমরা ব্যর্থ বলব?
সমস্যাটা সফল হওয়ায় নয়। সমস্যাটা হলো, আমরা সফলতার মানে পাল্টে ফেলেছি।
এখন অনেকেই ভাবে, দামি ফোন মানেই সফলতা, বড় গাড়ি মানেই সফলতা, বিদেশ ভ্রমণ মানেই সফলতা। অথচ এগুলো জীবনের একটা অংশ মাত্র। এগুলো থাকতেই পারে। কিন্তু এগুলোই যখন একজন মানুষের পুরো পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, তখনই বিপদ শুরু হয়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের। তারা ছোটবেলা থেকেই দেখছে—কোন ব্র্যান্ডের জামা পরো, কোন ফোন চালাও, কোথায় ঘুরতে যাও—এসব নিয়েই যত আলোচনা। ফলে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে, মানুষ হিসেবে ভালো হওয়ার চেয়ে বিত্তবান দেখানো বেশি জরুরি।
এই ভাবনাটা নীরবে আমাদের বদলে দিচ্ছে।
এর ছাপ পড়ছে পরিবারেও। কেউ বেশি আয়ের আশায় নিজের সমস্ত সময় কাজে ঢেলে দিচ্ছেন। কেউ আবার একটা জীবন ধরে রাখতে গিয়ে ঋণের নিচে চাপা পড়ছেন। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেকেই ক্লান্ত।
টাকার দরকার আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভালো থাকতে কে না চায়? গোল বাধে তখনই, যখন আমরা নিজের জন্য নয়, অন্যকে দেখানোর জন্য বাঁচতে শুরু করি। তখন নিজের ইচ্ছার চেয়ে মানুষের বাহবা বড় হয়ে ওঠে।
তাই মাঝে মাঝে নিজেকেই জিজ্ঞেস করা দরকার—আমি যা করছি, সেটা কি সত্যিই আমার প্রয়োজন? নাকি শুধু লোককে দেখানোর জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তর যদি সৎভাবে দিতে পারি, তাহলে অনেক অপ্রয়োজনীয় দৌড় থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা সম্ভব।
কারণ তুলনার এই দৌড়ের শেষ নেই। আপনার চেয়ে বড় গাড়ি, বড় বাড়ি, বেশি আয়ের মানুষ সব সময়ই থাকবে। অন্যকে হারিয়ে শান্তি মেলে না।
বরং গত বছরের নিজের সঙ্গে আজকের নিজেকে মেলানোই দরকার। আমি কি আগের চেয়ে একটু ভালো মানুষ হয়েছি? একটু বেশি সৎ হয়েছি? পরিবারকে কি একটু বেশি সময় দিতে পারছি? রাতে কি আগের চেয়ে একটু বেশি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছি?
হয়তো এই প্রশ্নগুলোর ভেতরেই সত্যিকারের সফলতার উত্তর লুকিয়ে আছে।
শেষ পর্যন্ত মানুষকে সুখী করে না শুধু টাকা। সুখী করে নিশ্চিন্ত একটা ঘুম, পরিবারের সঙ্গে নির্ভার কিছু সময়, আর এমন কয়েকজন মানুষ, যাদের কাছে মন খুলে সব বলা যায়।
হয়তো সময় এসেছে সফলতার মুখোশটা একটু সরিয়ে দেখার। কারণ সব ঝলমলে জীবন সুখের নয়। আবার সব সাধারণ জীবনও ব্যর্থ নয়। যে মানুষ নিজের সামর্থ্যের ভেতরে থেকেও সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে, নিজের মানুষগুলোকে ভালো রাখতে পারে, আর রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে স্বস্তি খুঁজে পায়—আমার কাছে সত্যিকারের সফল মানুষ সে-ই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।