জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাত দুটো।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেছে। শুধু রান্নাঘরের পাশের ছোট ঘরটায় আলো জ্বলছে। একজন মা বারবার থার্মোমিটারটা দেখছে। একবার ১০২, একটু পর ১০১.৮। মেয়েটার কপালে হাত রাখছে। গামছাটা আবার ভিজিয়ে আনছে। মেয়েটা আধঘুমে বলে, ‘মা, তুমি ঘুমাও।’
মা বলে, ‘হ্যাঁ, ঘুমাব।’
ঘুমায় না।
এই দৃশ্যের নাম নারী জাগরণ নয়। কোনো মঞ্চে এর জন্য হাততালি পড়ে না। কোনো পোস্টারে লেখা থাকে না। অথচ পৃথিবীর কোটি কোটি নারীর জীবন এইভাবেই কেটে যায়—অন্যের ঘুম পাহারা দিতে দিতে।
তাহলে যখন বলা হয়, ‘জাগো নারী’, কাকে জাগতে বলা হয়?
যে নারী রাত দুটোয় সন্তানের জ্বর দেখে, ভোরে উঠে রান্না করে, বাস ধরার আগে মেয়েকে স্কুলে পাঠায়, অফিসে গিয়ে সারাদিন কাজ করে, সন্ধ্যায় বাজার করে, রাতে স্বামীর ওষুধ খুঁজে দেয়—সে কি ঘুমিয়ে আছে?
না।
সমস্যাটা বরং অন্য জায়গায়।
অনেক সময় নারীকে জাগতে বলা হয়, কারণ তার জেগে ওঠাটা অন্যদেরও দরকার। কিন্তু সে কী চায়, সেটা জানতে খুব বেশি আগ্রহ থাকে না।
চাকরি করতে চাইলে প্রশ্ন আসে—বাচ্চাদের কী হবে?
বিয়ে করতে না চাইলে—এত পড়াশোনা করে লাভ কী?
নিজের মতো করে থাকতে চাইলে—মানুষ কী বলবে?
সংসারে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে—এত জেদ কেন?
কথাগুলো খুব সাধারণ। এত সাধারণ যে এগুলোকে অন্যায় বলতেও অনেকের অস্বস্তি হয়।
কিন্তু একই কথা প্রতিদিন শুনতে শুনতে একজন মানুষ একসময় নিজের ইচ্ছেটাকেই সন্দেহ করতে শুরু করে।
আমার দেখা একটি মেয়ের কথা মনে পড়ে। সে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চেয়েছিল। বাড়িতে আপত্তি ছিল। খুব বড় কোনো ঝগড়া হয়নি। কেউ তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়নি, কেউ গালিও দেয়নি। শুধু প্রায়ই বলা হতো, ‘এত কষ্ট করে চাকরি করার দরকার কী?’
কথাটা শুনতে কত সামান্য।
কিন্তু প্রতিদিন শুনতে শুনতে একসময় মেয়েটার নিজের ইচ্ছেটাই যেন অপরাধ হয়ে উঠছিল।
সে শেষ পর্যন্ত চাকরিটা করেছিল।
কীভাবে করেছিল, সেটাই হয়তো এই লেখার আসল বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—একদিন সে বলেছিল, ‘আমার জীবনটা আমি একবার নিজের মতো করে দেখতে চাই।’
বাক্যটা ছোট।
কিন্তু তার জন্য সহজ ছিল না।
সেদিন কোনো দেয়াল ভাঙার শব্দ হয়নি। কোনো আগুন জ্বলেনি। কেউ হাততালি দেয়নি।
শুধু একটি মেয়ে নিজের জীবনের ওপর প্রথমবার নিজের নাম লিখেছিল।
নারী জাগরণের কথা বলতে গিয়ে আমরা বড় বড় শব্দ ব্যবহার করি—স্বাধীনতা, অধিকার, সমতা। শব্দগুলোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু তারও আগে দরকার একটি ছোট্ট জায়গা, যেখানে একজন নারী একা বসে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে—
আমি কী চাই?
এই প্রশ্নটিই অনেক নারীর জীবনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।
ছোটবেলা থেকেই মেয়েরা অন্যের প্রয়োজন বুঝতে শেখে। বাবা কী চান, মা কী চান, ভাই কী চায়, স্বামী কী চান, সন্তান কী চায়। সবাইকে বুঝতে বুঝতে একসময় নিজের চাওয়াটা কোথায় ছিল, সেটাই ভুলে যায়।
তারপর একদিন বয়স হয়ে যায়।
সংসার গুছানো। সন্তান বড়। ঘর ঠিকঠাক। সবকিছু যেন নিজের জায়গায়।
শুধু নারীটি নিজেই কোথায়?
হয়তো এখানেই ‘জাগো নারী’ কথাটাকে নতুন করে ভাবা দরকার।
নারীকে জাগানো মানে তাকে আরও দায়িত্ব দেওয়া নয়। আরও সহ্য করতে বলা নয়। আরও ত্যাগের গল্প শোনানোও নয়।
বরং কোনো এক সকালে তাকে আয়নার সামনে দাঁড়াতে দিতে হবে—একটু নিরিবিলিতে।
সে কী চায়, সেটা শোনার জন্য।
হয়তো সে চাকরি করতে চায়। হয়তো বই পড়তে চায়। হয়তো সংসার করতে চায়, কিন্তু নিজের শর্তে। হয়তো কোনো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। আবার হয়তো কিছুই বদলাতে চায় না।
শুধু নিজের সিদ্ধান্তটা নিজে নিতে চায়।
এতটুকু অধিকার কি খুব বেশি?
প্রশ্নটা আসলে ‘নারী কবে জাগবে’ নয়।
প্রশ্নটা হলো,
নারী যখন নিজের মতো করে জেগে উঠবে,
তখন আমরা কি সত্যিই তাকে সেইভাবে বাঁচতে দেব?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।