যে ক্লান্তি দেখা যায় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকার কোনো একটি গলিতে ভোর হয়। আজানের শব্দ থামার আগেই কারও রান্নাঘরে চুলা জ্বলে ওঠে। একজন মা সন্তানের স্কুলের পোশাক গুছিয়ে দেন, টিফিন বানান, নিজের চুলটা বাঁধার সময়ও পান না। একটু পর তাঁকে দেখা যায় এক হাতে শিশুর হাত, অন্য হাতে বাজারের ব্যাগ। দিনের শুরুতেই তাঁর নিজের জন্য সময়টুকু কোথায় যেন হারিয়ে যায়—আর এই দৃশ্যটা এতটাই পরিচিত যে আমরা আর তাকাইও না।
মেয়েদের বড় হওয়ার গল্পটাও অনেকটা এমন। কৈশোরে শরীরে পরিবর্তন আসে। মাসিকের সময় রক্তক্ষরণ হয়, ব্যথা হয়, দুর্বল লাগে। তারপর একসময় সন্তান জন্ম দেওয়ার দায়িত্ব আসে। গর্ভধারণ, প্রসব, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো—শরীরের ওপর দিয়ে যায় বড় এক পরিবর্তন। এসবকে আমরা খুব স্বাভাবিক বলে মেনে নিই।
স্বাভাবিক, অবশ্যই। কিন্তু স্বাভাবিক মানেই কষ্টহীন নয়।
সমস্যাটা সম্ভবত এখানেই। সমাজ নারীর সহ্য করার ক্ষমতাকে এত স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে যে তাঁর ক্লান্তিটাও অনেক সময় আলাদা করে দেখা হয় না।
একজন নারী অফিস থেকে ফিরে রান্না করলেন। সন্তানের পড়া দেখলেন। শ্বশুরের ওষুধের সময় মনে রাখলেন। পরদিন মেয়ের স্কুলে অনুষ্ঠান আছে, সেটাও মাথায় রাখলেন। স্বামীর কোনো কাজ বাকি আছে কি না, সেটাও হয়তো তাঁকেই মনে করিয়ে দিতে হলো।
একটা একটা করে দেখলে কোনোটাই খুব বড় কাজ না। দুধ আনা, ওষুধ মনে রাখা, স্কুলের খাতা দেখা, রাতের খাবার গরম করা। কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে মাথায় নিয়ে ঘোরা—ওই ভারটাই আসল।
এই ভারের একটা অংশ চোখে দেখা যায় না।
কেউ হয়তো বলবেন, সংসারে তো সবাইকেই দায়িত্ব নিতে হয়। কথাটা ঠিক। পুরুষও কাজ করেন, ক্লান্ত হন, সংসারের জন্য আয় করেন, নানা চাপ সামলান। তাই নারীর প্রতিটি কষ্টকে আলাদা করে বিশেষ কিছু বলারও প্রয়োজন নেই।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
একই সংসারে কে কাজ করবে, আর কে কাজটা মনে রাখবে—এই দুটো কি একই দায়িত্ব?
রাতে শিশুর জ্বর এলে শুধু ওষুধ দেওয়াই কাজ নয়। কখন ওষুধ দিতে হবে, শেষ কবে দেওয়া হয়েছিল, সকালে ডাক্তার দেখাতে হবে কি না—এসবও কারও মাথায় থাকে। বাড়িতে চাল শেষ হয়ে গেলে শুধু বাজারে যাওয়া নয়, চাল শেষ হয়ে আসছে সেটাও আগে বুঝতে হয়।
এই অদৃশ্য হিসাবটাই একজন মানুষকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে।
তারপরও তাঁকে বলা হয়, “তুমি তো সব সামলে নিতে পারো।”
এই কথাটার মধ্যে ভালোবাসা আছে, বিশ্বাসও আছে। কিন্তু কখনো কখনো এর মধ্যে আরেকটি চাপ লুকিয়ে থাকে—তুমি পারো, তাই তোমাকেই পারতে হবে।
নারীর শক্তি নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। বলি, মেয়েরা অনেক সহনশীল। তারা বিপদের সময় পরিবারকে আগলে রাখে। কথাগুলো সত্যি হতে পারে। কিন্তু একটা সময় গিয়ে প্রশ্ন করা দরকার—এই শক্তির প্রশংসা কি কখনো তাঁদের ওপর আরও কিছু চাপিয়ে দেওয়ার সহজ উপায় হয়ে যাচ্ছে?
“ও তো শক্ত মেয়ে”—এই একটি বাক্য দিয়ে হয়তো তার কান্নাটা এড়িয়ে যাওয়া যায়। “ও সব পারে”—বলে তার বিশ্রামটাও পিছিয়ে দেওয়া যায়।
আর তখন নিজের স্বপ্নগুলো?
একজন নারী হয়তো গান গাইতে চাইতেন। কেউ পড়াশোনা শেষ করতে চেয়েছিলেন। কেউ চাকরি করতে চেয়েছিলেন, কেউ ব্যবসা শুরু করতে। সংসার করতে গিয়ে সব স্বপ্ন মরে যায় না। কিছু স্বপ্ন শুধু চুপ করে থাকে। আলমারির এক কোণে রাখা পুরোনো শাড়ির মতো—আছে, কিন্তু ব্যবহার করার সুযোগ হয় না।
সবচেয়ে অদ্ভুত হলো, নারী কাঁদলে তাঁকে আবেগী বলা হয়, রাগ করলে বলা হয় বেশি প্রতিক্রিয়াশীল। অথচ বছরের পর বছর চুপ করে থাকলে বলা হয়, “ও অনেক বুঝদার।”
তাহলে তাঁর স্বাভাবিক অনুভূতিগুলোর জায়গাটা কোথায়?
নারীকে শক্ত হতে হবে—এ কথা বলার আগে হয়তো আমাদের ভাবা দরকার, তাঁকে সবসময় শক্ত থাকার প্রয়োজনটাই বা কেন তৈরি হচ্ছে।
সংসার কারও একার নয়। সন্তানের দায়িত্ব শুধু মায়ের নয়। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্নও শুধু মেয়ের বা বউয়ের দায়িত্ব হতে পারে না। ঘরের কাজের ভাগ শুধু কাজ দিয়ে মাপা যায় না; কে পরিকল্পনা করছে, কে মনে রাখছে, কে সবসময় প্রস্তুত থাকছে—সেটাও হিসাবের মধ্যে আসা দরকার।
কারণ শক্ত থাকা আর শক্ত হয়ে থাকতে বাধ্য হওয়া এক জিনিস নয়।
একজন নারী কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারেন, সেটা জানার চেয়ে হয়তো আরও জরুরি প্রশ্ন হলো—তাঁকে এতটা কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে কেন?
প্রশ্নটা আমাদের তৈরি করা সেই সংসার নিয়ে, যেখানে একজন মানুষকে শক্ত বলেই তাঁর ক্লান্তিটাকে বারবার স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।