বুদ্ধের সময়ের পৃথিবী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বুদ্ধের সময়ের পৃথিবী কল্পনা করলে আমরা সাধারণত বোধিবৃক্ষের নিচে ফিরে যাই। চোখ বন্ধ করে বসে থাকা এক মানুষ, চারপাশে নীরবতা, তারপর নির্বাণের দিকে যাত্রা।
কিন্তু সেই নীরবতার বাইরে পৃথিবী তখন বেশ ব্যস্ত ছিল।
রাজারা যুদ্ধ করছিলেন। নতুন নগর উঠছিল। দূরদেশের পণ্য এক বাজার থেকে আরেক বাজারে যাচ্ছিল। সাম্রাজ্য তার সীমানা বাড়াচ্ছিল। আর এসবের মাঝখানে কিছু মানুষ পুরোনো প্রশ্নগুলোকেই নতুন করে করতে শুরু করেছিল।
বুদ্ধকে বুঝতে হলে সেই পৃথিবীটাকে একবার দেখা দরকার।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতাব্দীর ভারত ছিল বদলে যাওয়া এক ভূখণ্ড। গঙ্গার সমভূমিতে কৃষি ও বসতি বাড়ছিল, লোহার ব্যবহার বিস্তৃত হচ্ছিল, বাণিজ্য ও নগরজীবনের গুরুত্ব বাড়ছিল। মগধ ও কোশলের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছিল।
এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পুরোনো ধর্মীয় কাঠামোর সব উত্তর আর ঠিকমতো মিলে যাচ্ছিল না।
সেখানেই শ্রমণদের আবির্ভাব।
বুদ্ধ, মহাবীর এবং তাঁদের সমসাময়িক আরও অনেক চিন্তক মানুষের সামনে এমন প্রশ্ন রাখছিলেন, যার উত্তর শুধু যজ্ঞের বেদিতে পাওয়া যাচ্ছিল না। দুঃখ কেন? কর্মের অর্থ কী? জন্ম-মৃত্যুর এই ঘূর্ণি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ আছে?
বুদ্ধের বিশেষত্ব ছিল, তিনি মানুষের সমস্যার সমাধান খুঁজলেন কোনো নতুন রাজ্য বা বাহ্যিক শক্তির মধ্যে নয়। তিনি তাকালেন মানুষের নিজের আচরণ ও চেতনার দিকে।
কিন্তু ভারতের পশ্চিমে তখন মানুষকে সংগঠিত করার একেবারেই অন্য ধরনের পরীক্ষা চলছে।
পারস্যে সাইরাসের হাতে যে সাম্রাজ্যের শুরু, দারিয়ুসের সময়ে সেটি পরিণত হয়েছিল এক বিশাল প্রশাসনিক ব্যবস্থায়। তার বিস্তার উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
এই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মানবিক ছবি হয়তো রাজাদের ভাস্কর্যে নেই। আছে হিসাবের ফলকে।
পারসেপোলিসের দুর্গ-সংরক্ষণাগারের মাটির ফলকগুলোর অনেকগুলোতে এলামীয় ভাষায় লেখা আছে খাদ্য ও রসদের হিসাব—কোথায় কত শস্য গেল, কত শ্রমিক রেশন পেল, কত পশু বা যাত্রীর জন্য কী সরবরাহ করা হলো। কিছু নথিতে নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের খাদ্যবণ্টনের হিসাবও পাওয়া যায়।
রাজাদের নাম ইতিহাসে থেকে যায়। কিন্তু একটি সাম্রাজ্য প্রতিদিন টিকে থাকে এই ছোট ছোট হিসাবের ওপর।
কতজন শ্রমিক।
কত শস্য।
কত পশু।
কত রসদ।
সাম্রাজ্য মানুষকে গুনছিল।
বুদ্ধ মানুষকে গুনছিলেন অন্যভাবে।
কে কতটা লোভ বহন করছে। কতটা ক্রোধ। কতটা দুঃখ।
এই জায়গাটাই আমার কাছে বুদ্ধের সময়ের পৃথিবীকে দেখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জানালা।
একদিকে পারস্য মানুষকে একটি বিশাল রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনছিল। অন্যদিকে বুদ্ধের সংঘ তৈরি হচ্ছিল এমন একটি সম্প্রদায় হিসেবে, যেখানে মানুষের জন্ম বা বংশের চেয়ে তার অনুশীলন ও আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল।
দুটি ব্যবস্থা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। তাদের উদ্দেশ্যও এক নয়। তবু মানুষের জীবনকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাদের পার্থক্যটি চোখে পড়ার মতো।
একটি ব্যবস্থা বাইরে থেকে শৃঙ্খলা তৈরি করে।
অন্যটি ভেতর থেকে।
এই সময়ের পৃথিবীকে আরও বড় করে দেখলে চীনেও আরেক ধরনের উত্তর খুঁজতে দেখা যায় কনফুসিয়াসকে। তাঁর সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রশ্ন ছিল—পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের দায়িত্ব কোথায়? একজন শাসক কেমন হলে তার অধীনে মানুষ ভালোভাবে থাকতে পারে?
ভারতে প্রশ্নটা ক্রমে মানুষের দুঃখ ও মুক্তির দিকে যাচ্ছে। চীনে সামাজিক সম্পর্ক ও নৈতিকতার দিকে।
গ্রিসেও তখন রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে নতুন চিন্তার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। পারস্যের সঙ্গে যুদ্ধ শুধু সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ ছিল না; এথেন্সের মতো নগররাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক জীবনকেও তা বদলে দিচ্ছিল। কয়েক দশক পর সেই পৃথিবীতেই সক্রেটিস মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে জানতে চাইবেন—ন্যায় কী, জ্ঞান কী, ভালো জীবন বলতে কী বোঝায়?
তাঁদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ নেই। তাই বুদ্ধ, কনফুসিয়াস ও সক্রেটিসকে নিয়ে “একই সময়ে পৃথিবী জেগে উঠেছিল”—এই কথাটা শুনতে যত সুন্দর, ইতিহাসের বিচারে ততটা সরল নয়।
তবু সময়টার মধ্যে একটা গভীর মিল ছিল।
পুরোনো কাঠামো বদলাচ্ছিল।
ভারতে নগর ও রাষ্ট্রের উত্থান, চীনে রাজনৈতিক ভাঙন, গ্রিসে নগররাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর পারস্যে বিশাল সাম্রাজ্যের বিস্তার—সব মিলিয়ে মানুষের জীবন আগের জায়গায় থাকছিল না।
সমাজ বদলালে মানুষের প্রশ্নও বদলায়।
হয়তো বুদ্ধের সময়ের পৃথিবীর আসল গল্প এখানেই।
বুদ্ধ কোনো সাম্রাজ্য বানাননি। তাঁর হাতে সেনাবাহিনী ছিল না, কর আদায়ের ব্যবস্থা ছিল না, কোনো রাজপ্রাসাদও ছিল না। তিনি তৈরি করেছিলেন সংঘ—মানুষকে ভেতর থেকে বদলানোর একটি অনুশীলনভিত্তিক সম্প্রদায়।
পারস্য মানুষকে শাসনের জন্য সংগঠিত করেছিল।
বুদ্ধ মানুষকে নিজের ওপর কাজ করার জন্য।
একজনের শক্তি মাপা যায় তার নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে। অন্যজনের শক্তি মাপা যায় কত মানুষ নিজের লোভ, ক্রোধ আর মোহকে প্রশ্ন করতে শিখল—সে হিসাবে।
আড়াই হাজার বছর পরেও এই দুই দৃশ্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
পারসেপোলিসের মাটির ফলক আমাদের বলে দেয় একটি সাম্রাজ্য কীভাবে শস্য গুনত।
বুদ্ধের শিক্ষা আমাদের অন্য একটি হিসাবের কথা মনে করিয়ে দেয়—মানুষ নিজের ভেতরে কী জমিয়ে রাখছে।
সম্ভবত এই কারণেই বুদ্ধের সময়ের পৃথিবী আজও এত দূরের মনে হয় না।
সাম্রাজ্য বদলেছে। রাষ্ট্র বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে।
কিন্তু মানুষকে বাইরে থেকে শাসন করা আর ভেতর থেকে বদলে দেওয়া—এই দুই পথের টানাপোড়েন এখনো শেষ হয়নি।
কেউ সাম্রাজ্য বানাচ্ছিল। কেউ সংঘ।
ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে প্রশ্নটা তাই আজও রয়ে যায়—
মানুষকে বদলানো কঠিন, নাকি মানুষকে শাসন করা?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।