যখন নিজের স্মৃতিকেই বিশ্বাস হয় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
মানসিক নির্যাতন, আত্মসন্দেহ ও সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব
১৯ অক্টোবর ২০২৬
স্ত্রী প্রতিবার বলতেন, “আমি এমন কথা কখনো বলিনি।” কয়েক বছর পর স্বামী নিজের স্মৃতির ওপরও ভরসা করতে পারছিলেন না।
প্রথম দিকে তিনি প্রতিবাদ করতেন। বলতেন, কথাটা তো তুমি নিজেই বলেছিলে। সেদিনের ঘটনাটাও তো তোমার মনে থাকার কথা। কিন্তু প্রতিবার একই উত্তর পেতেন। স্ত্রী বলতেন, তিনি ভুল শুনেছেন, ভুল বুঝেছেন, কিংবা নিজের মতো করে কথা বানিয়ে নিচ্ছেন। কখনো তাঁকে অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ বলা হতো, কখনো বলা হতো, তিনি ছোট বিষয় নিয়ে অকারণে ঝামেলা তৈরি করেন।
শুরুতে এসব কথায় তাঁর রাগ হতো। পরে মন খারাপ হতো। একসময় তিনি চুপ করে যেতে শিখলেন।
এখন কোনো কথা নিয়ে মতবিরোধ হলে তিনি আর নিশ্চিতভাবে নিজের বক্তব্য রাখতে পারেন না। মনে মনে ঘটনাটি মনে করার চেষ্টা করেন। কখন বলা হয়েছিল, কোথায় বসে ছিলেন, কথার আগে কী ঘটেছিল—সবকিছু মনে করতে চান। তবু কোথাও একটা সন্দেহ থেকে যায়। সত্যিই কি তিনি কথাটা ঠিকমতো মনে রেখেছেন? নাকি নিজের ভুলকে ঢাকতে চাইছেন?
যে মানুষটি একসময় নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন, তিনি ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতিকেই সন্দেহ করতে শুরু করলেন।
সন্দেহের শুরুটা সব সময় বড় কোনো ঘটনা দিয়ে হয় না।
কখনো একটি কথার অস্বীকার, কখনো কোনো ঘটনার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, কখনো নিজের আচরণের জন্য অন্য মানুষটিকেই দোষী বানানো—এভাবে একটি সম্পর্কের ভেতর অস্বস্তি জমতে পারে। সমস্যা তখনই গভীর হয়, যখন এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বারবার ঘটতে থাকা একটি আচরণে পরিণত হয়।
মানসিক নির্যাতনের এমন একটি ধরনকে বলা হয় গ্যাসলাইটিং। এতে একজন মানুষ ধারাবাহিকভাবে অন্যজনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি কিংবা বিচারবুদ্ধিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেন। এমনভাবে কথা বলা হয়, যেন সমস্যার উৎস সব সময় সেই মানুষটি নিজেই। তিনি কিছু মনে করলে বলা হয়, তাঁর ধারণা ভুল। তিনি কষ্ট পেলে বলা হয়, তিনি অকারণে বাড়াবাড়ি করছেন। কোনো আচরণের প্রতিবাদ করলে বলা হয়, তাঁর কারণেই পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে।
এখানে শুধু একটি ঘটনার সত্যতা নিয়ে মতবিরোধ থাকে না। ধীরে ধীরে একজন মানুষের নিজের উপলব্ধির ওপর আস্থাই নড়বড়ে হয়ে যায়।
তবে একটি ঘটনা নিয়ে দুজনের স্মৃতি আলাদা হওয়া, কেউ কোনো কথা ভুলে যাওয়া কিংবা মতের অমিল হলেই তাকে গ্যাসলাইটিং বলা যায় না। মানুষের স্মৃতি সব সময় হুবহু এক থাকে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো আচরণের ধারাবাহিকতা, তার ধরন এবং সেই আচরণ ব্যবহার করে কাউকে বারবার নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্দেহে ফেলে রাখা হচ্ছে কি না।
যখন নিজের বিচারবুদ্ধিকেই আর বিশ্বাস করা যায় না
লোকটির জীবনে পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে এসেছিল।
আগে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে তিনি খুব বেশি দ্বিধা করতেন না। কী কিনবেন, কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে কথা বলবেন—নিজের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতেন। ভুল হলে স্বীকার করতেন, প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত বদলাতেন। কিন্তু এখন সাধারণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তিনি স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে চিন্তা করেন।
কোনো কথা বলার আগে ভাবেন, কথাটি পরে অস্বীকার করা হবে না তো? কোনো ঘটনা মনে করিয়ে দিতে গিয়ে থেমে যান, কারণ আবার যদি বলা হয় যে তিনি ভুল মনে রেখেছেন? নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়েও দ্বিধা করেন। হয়তো তাঁরই ভুল, হয়তো তিনি বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন—এমন ভাবনা তাঁকে বারবার পিছিয়ে দেয়।
ধীরে ধীরে নিজের সিদ্ধান্তের দায়ও তিনি অন্যের হাতে তুলে দিতে থাকেন। কী ঠিক, কী ভুল, কোন ঘটনাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, কোন বিষয়টি ভুলে যাওয়া উচিত—এসব নিয়ে অন্যজনের মতামতই তাঁর কাছে বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে।
বাইরে থেকে তাঁকে শান্ত মানুষ মনে হতে পারে। কেউ ভাবতে পারেন, তিনি ঝগড়া এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। কিন্তু তাঁর নীরবতার পেছনে থাকতে পারে অন্য এক ভয়—নিজের বক্তব্যে স্থির থাকলে আবারও তাঁকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা হবে।
এভাবে সম্পর্কের মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রাখার শক্তি কমে আসে। মানুষটি শুধু অন্যের সঙ্গে মতবিরোধ করতে ভয় পান না; নিজের মন কী বলছে, সেটাও গুরুত্ব দিয়ে শুনতে দ্বিধা করেন।
এটাই এমন আচরণের একটি গভীর ক্ষতি। একজন মানুষকে শুধু তাঁর বক্তব্য থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় না, নিজের বক্তব্যের ওপর বিশ্বাস রাখার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
সব দোষ নিজের বলে মনে হওয়া
লোকটি এখন প্রায়ই ভাবেন, সংসারে অশান্তি হলে নিশ্চয়ই তাঁরই কোনো ভুল হয়েছে। স্ত্রী রেগে গেলে আগের কথাগুলো খুঁজে দেখেন—কোথায় এমন কিছু বলেছিলেন, যা থেকে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। স্ত্রী কষ্ট পেয়েছেন বললে তিনি নিজের আচরণ নিয়ে ভাবেন, যদিও কী করেছেন তা সব সময় বুঝতে পারেন না।
নিজের ভুল খুঁজে দেখা অবশ্যই খারাপ কিছু নয়। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রতিটি সমস্যার জন্য নিজেকেই দায়ী ভাবা আত্মসমালোচনা নয়। সেখানে নিজের ভুল স্বীকার করার পাশাপাশি অন্যের আচরণের দায়টুকুও আলাদা করে দেখা দরকার।
একটি সম্পর্কের সমস্যা সব সময় একজন মানুষের একার তৈরি হয় না। কেউ ভুল করতে পারেন, কেউ রাগের মাথায় কষ্টদায়ক কথা বলতে পারেন, আবার কেউ নিজের দায় এড়াতে অন্যকে দোষী করে তুলতে পারেন। এই পার্থক্যগুলো বোঝা জরুরি।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিজের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা হলে মানুষটি হয়তো আর সেই পার্থক্য করতে পারেন না। অন্যের আচরণে কষ্ট পেলেও ভাবেন, কষ্ট পাওয়াটাই বুঝি তাঁর ভুল। প্রতিবাদ করতে গিয়ে অপরাধবোধ হয়। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে শেষ পর্যন্ত আর কথা বাড়াতে চান না।
এই নীরবতা দেখে অন্যরা হয়তো ভাবেন, সমস্যা মিটে গেছে। অথচ মানুষটির ভেতরে প্রশ্নগুলো রয়ে যায়। তিনি জানেন না, নিজের অনুভূতিকে বিশ্বাস করবেন, নাকি আবারও সেটিকে ভুল বলে সরিয়ে রাখবেন।
নিজের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ
এমন পরিস্থিতিতে নিজের স্মৃতি প্রমাণ করার জন্য প্রতিটি কথোপকথনকে লড়াইয়ে পরিণত করা জরুরি নয়। একইভাবে, সম্পর্কের শান্তি বজায় রাখার জন্য নিজের অভিজ্ঞতাকে বারবার অস্বীকার করাও সমাধান নয়।
প্রথমে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে, সম্পর্কের মধ্যে কী ঘটছে। কোনো একটি কথার অমিল, নাকি একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে? মতবিরোধ হলে কি দুজনেই নিজেদের বক্তব্য বলার সুযোগ পান, নাকি প্রতিবার একজনকেই ভুল, অযৌক্তিক কিংবা দোষী প্রমাণ করা হয়? নিজের কষ্টের কথা বললে তা শোনার চেষ্টা করা হয়, নাকি সেই কষ্টকেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না। তবু প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো মানুষকে শুধু নিজের ভুল খুঁজতে নয়, সম্পর্কের আচরণগুলোও নিরপেক্ষভাবে দেখতে সাহায্য করে।
নিরাপদ মনে হলে নিজের মনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, তারিখ কিংবা কথোপকথনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখে রাখা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য কাউকে হারানো বা প্রতিটি ঘটনার চূড়ান্ত প্রমাণ তৈরি করা নয়। বরং নিজের অভিজ্ঞতাকে গুছিয়ে বোঝা, যাতে পরে কোনো ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে নিজের উপলব্ধি যাচাই করার একটি অবলম্বন থাকে।
বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলাও সহায়ক হতে পারে। এমন কেউ, যিনি তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না দিয়ে মন দিয়ে শুনবেন। পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক কষ্ট তৈরি করলে কিংবা নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেললে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। আর সম্পর্কে ভয় দেখানো, হুমকি বা অন্য কোনো নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে নিজের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
সব সম্পর্কের মতবিরোধ একই রকম নয়, আর সব সমস্যার সমাধানও একই পথে হয় না। কিন্তু কোনো সম্পর্কের মধ্যে নিজের অভিজ্ঞতা বলার অধিকার, প্রশ্ন করার সুযোগ এবং সম্মানের সঙ্গে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা দরকার।
খাতার পাতায় ফিরে পাওয়া কয়েকটি তারিখ
একদিন পুরোনো জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে লোকটি একটি খাতা খুঁজে পেলেন। খাতাটি অনেক দিনের। কয়েকটি পাতায় বাজারের হিসাব, কিছু অসমাপ্ত তালিকা, আর মাঝেমধ্যে নিজের হাতে লেখা ছোট ছোট নোট।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে তিনি একটি তারিখের পাশে লেখা কয়েকটি লাইন দেখতে পেলেন। সেখানে একটি ঘটনার কথা লিখেছিলেন তিনি। আরেকটি পাতায় ছিল অন্য একটি দিনের বিবরণ। কথাগুলো খুব দীর্ঘ নয়, কোনো বড় ব্যাখ্যাও নেই। শুধু কী ঘটেছিল, তখন তাঁর কেমন লেগেছিল, সেটুকুই লেখা।
তিনি অনেকক্ষণ পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
খাতাটি তাঁর সব প্রশ্নের উত্তর দিল না। এতে লেখা প্রতিটি কথা যে নির্ভুল, এমন নিশ্চয়তাও তিনি পেলেন না। তবু একটি বিষয় বুঝতে পারলেন—সেই সময়ে ঘটনাগুলো তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল বলেই তিনি লিখে রেখেছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল, তাঁর অনুভূতিও ছিল। সেগুলোকে একেবারে অর্থহীন বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি খাতাটি বন্ধ করলেন। বহুদিন পর নিজের মনে হওয়া কথাগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে ভুল বলে ধরে নিলেন না।
হয়তো এটাই তাঁর জন্য খুব ছোট একটি শুরু। নিজের স্মৃতিকে অন্ধভাবে সত্য বলে মেনে নেওয়া নয়, আবার অন্য কারও অস্বীকারের কারণে নিজের অভিজ্ঞতাকে মিথ্যা ধরে নেওয়াও নয়। বরং সময় নিয়ে ঘটনা বোঝা, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়া এবং নিজের অনুভূতিকেও বিবেচনার মধ্যে রাখা।
কারণ একটি সম্পর্কের মধ্যে অন্যের কথা শোনা যেমন জরুরি, নিজের কথাটুকু শোনাও তেমনই জরুরি।
খাতাটি তিনি আবার আলমারিতে তুলে রাখলেন না। টেবিলের এক পাশে রেখে দিলেন।
এবার পাতাগুলোতে কী লেখা আছে, তা শুধু মনে রাখার জন্য নয়—নিজের অভিজ্ঞতাকে আর অবহেলা না করার জন্যও।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।