এক মুহূর্তেই সব শেষ — আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ২১ নভেম্বর ২০২৫
(আজ সকালে যে ১০.৪০ সেকেন্ড আমার বুক কাঁপিয়ে দিলো, সেই গল্পটা পড়ে দেখো)
আজ শুক্রবার সকালে নাস্তা সেরে বিছানায় হেলান দিয়ে চা খাচ্ছিলাম। বাচ্চা দুটো পাশে বসে কার্টুন দেখছিল। হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন পুরো বাড়িটাকে দুই হাতে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। চায়ের কাপ হাত থেকে ছিটকে পড়ল। গরম চা শার্টে লাগল, কিন্তু তখন ব্যথা টের পাইনি।
মেয়ে দুটো চিৎকার করে আমার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, “বাবা! বাড়ি ভাঙছে!” আমার বুকটা থরথর করে কাঁপছে। দেওয়ালের পলেস্তারা খসে মেঝেতে পড়ছে। ফ্যানটা এমন ঘুরছে যেন এখনই ছিঁড়ে পড়বে। মাত্র দশ সেকেন্ড। কিন্তু ওই দশ সেকেন্ডে আমার চোখের সামনে জীবনটা যেন ফিল্মের মতো চলে গেল।
নিচে নামার সময় দেখি পুরো বাড়ির লোক সিঁড়িতে। কেউ কোলে বাচ্চা নিয়ে কাঁদছে, কেউ খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে, কারো হাতে শুধু মোবাইল।
ষষ্ঠ তলা থেকে নামতে যে এক মিনিট লাগে, আজ মনে হচ্ছিল ওই এক মিনিটও পাব না।
যদি আরেকটু লম্বা চলত?
যদি বিল্ডিংটা ভেঙে পড়ত?
তখন কি সিঁড়ি দিয়ে নামার সুযোগ থাকত?
আমাদের বিল্ডিংটা ২০০৮-০৯ সালে বানানো। মালিক বলেছিল পাঁচ তলার প্ল্যান। এখন আট তলা। নিচে দোকান-মার্কেট, ওপরে আরো তিন তলা চুপিচুপি তোলা। কলামের ভিতরে ইটের গুঁড়ো, রডের বদলে তার। গত বছর রাজউকের লোক এসেছিল। পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে “ম্যানেজ” করে চলে গেছে। এই গল্প শুধু আমার না। গোড়ান, খিলগাঁও, বাড্ডা, রামপুরা, মিরপুর, উত্তরা, বনানী—যেখানেই যান, একই কাহিনি।
আমরা ভাড়াটিয়ারা শুধু টাকা দিয়ে ঘর ভাড়া নিই, কিন্তু জানি না যে ঘরটা আমাদের কবর হয়ে যেতে পারে।
আজ শুধু ঢাকা না, গোটা বাংলাদেশ কেঁপে উঠেছে। চট্টগ্রামের বন্ধু ফোন করে বলল,
“ভাই, আমাদের বাড়ির পানির ট্যাংক পর্যন্ত দুলছিল।”
সিলেটের মামা বললেন,
“জানালার কাচ ঝনঝন করে উঠল।”
রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া, কক্সবাজার—সব জায়গা থেকে একই খবর।
৫.৭ মাত্রা। কাগজে ছোট সংখ্যা। কিন্তু যারা উঁচু তলায় থাকি, আমরা জানি—এটা ছিল শুধু ট্রেলার। আসল ছবি এখনো বাকি।
বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর বলে আসছেন—ঢাকার নিচে যে ফল্টলাইন আছে, সেটা যদি একবার জেগে ওঠে, ৭.৫-৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে লাখ লাখ মানুষ একসাথে মারা যাবে। ৭০% ভবন ধসে পড়বে। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে পারবে না। হাসপাতাল উপচে পড়বে। বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস সব বন্ধ। যারা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকবে, তাদের বের করার মতো প্রশিক্ষিত লোকবল আমাদের নেই।
আর আমরা? আমরা শুধু বলি, “আল্লাহ ভরসা।”
আল্লাহ ভরসা ঠিক আছে। কিন্তু আল্লাহ তো বলেছেন—উটের পা বেঁধে তারপর ভরসা করো। আমরা কি পা বেঁধেছি? না।
আমরা শুধু চোখ বন্ধ করে আছি।
আজকের এই কাঁপুনিটা ছিল আল্লাহর রহমত। একটা শেষ সুযোগ। আরেকবার ভুলে গেলে, পরেরবার হয়তো কেউ লিখতে পারবে না, “আলহামদুলিল্লাহ বেঁচে গেছি।”
তাই আমি আর দেরি করছি না। আজ থেকেই শুরু করছি—
১. বাড়ির মালিকের কাছে বিল্ডিংয়ের প্ল্যান আর কাগজপত্র চাইব।
২. একটা জরুরি ব্যাগ তৈরি করব—তিন লিটার পানি, শুকনো খাবার, টর্চ, ফার্স্ট এইড কিট, বাচ্চাদের জন্ম সনদ আর গুরুত্বপূর্ণ কাগজের কপি, পাওয়ার ব্যাংক।
৩. বাচ্চাদের শিখিয়ে দেব—কাঁপলে টেবিলের নিচে যেতে হবে, দৌড়ে সিঁড়িতে যাবে না।
৪. বউয়ের সঙ্গে বসে প্ল্যান করব—কে কোথায় যাবে, কে কার হাত ধরবে, বের হওয়ার পর কোথায় মিলিত হব।
৫. বিল্ডিংয়ের অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলব—সবাই মিলে মালিকের ওপর চাপ দেব।
৬. যে খোলা মাঠটা কাছে আছে, সেটা মনে রাখব—ভূমিকম্প হলে সেখানেই যাব।
এগুলো করতে কোনো টাকা লাগে না। শুধু একটু সচেতনতা লাগে। আর ভালোবাসা—নিজের পরিবারের প্রতি।
তোমরা যারা এতক্ষণ ধৈর্য ধরে পড়ছ, তোমাদের বাড়ির অবস্থাও তো একই। তোমার বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে বলো—তুমি কি আর দেরি করতে পারো?
আমি আর পারছি না। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকালেই চোখে পানি চলে আসে। ওদের জন্য হলেও আজ থেকে শুরু করছি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।
আর এমন তাওফিক দিন, যেন আমরা শুধু বেঁচে থাকি না—নিজের পরিবারকে বাঁচাতেও পারি। আমিন।
তোমরা কারা কারা আজ রাতের মধ্যেই জরুরি ব্যাগ তৈরি করতে যাচ্ছো? কমেন্টে “আমি” লিখে জানাও, আর শেয়ার করে অন্যদেরও জাগিয়ে দাও—যেন পরের কাঁপুনিতে আর কেউ হারিয়ে না যায়।
#একমুহূর্তেইসবশেষ #আজকেরভূমিকম্প #আমরাএখনোবেঁচেআছি #জরুরিব্যাগতৈরিকরি #প্রস্তুতিএখনই #জেগেওঠোবাংলাদেশ #আল্লাহভরসা #ঢাকারভূমিকম্প #ভূমিকম্পপ্রস্তুতি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।