নিশির দিনগুলো
গল্প-৯ : সমাজের বিচার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১৫ জুলাই, ২০২৬
একজন বিধবা হাসলে সমাজ প্রশ্ন তোলে, কাঁদলেও প্রশ্ন তোলে।
অভিক চলে যাওয়ার পর প্রথম দিকে নিশি খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। অফিস থেকে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিত, মেঘ আর মিশির সঙ্গে সময় কাটাত। বাইরে যাওয়া বলতে শুধু অফিস আর বাজার, এইটুকুই।
তখন মানুষ বলত,
"দেখেছ? এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি।"
কয়েক বছর কেটে গেল।
ধীরে ধীরে নিশি আবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
অফিসের এক অনুষ্ঠানে সহকর্মীদের সঙ্গে একটা ছবি তুলেছিল। ছবিটা অফিসের ফেসবুক পেজে আসতেই পাশের বাড়ির একজন এসে বললেন,
"তোমাকে তো বেশ হাসিখুশি লাগছে!"
কথাটা প্রশংসা ছিল না। নিশি সেটা বুঝতে পেরেছিল।
আরেকদিন ঈদের সকালে একটা নতুন শাড়ি পরে বেরিয়েছিল। এক আত্মীয়া তাকিয়ে বললেন,
"এখন আবার এত সাজগোজের কী দরকার?"
নিশি শুধু হেসে পাশ কাটিয়ে গেল। মনে মনে একটা কথাই ঘুরছিল,
যখন কাঁদতাম, তখনও কথা ছিল। এখন একটু হাসছি, তাতেও কথা। তাহলে ঠিক কোনটা করলে মানুষের আপত্তি থাকবে না?
এক সন্ধ্যায় মেঘ বলল,
"মা, তুমি এখন আর আগের মতো হাসো না কেন?"
নিশি মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল,
"হাসলেও অনেকের সমস্যা হয়।"
মেঘ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
"তাহলে ওদের সমস্যাটা ওদেরই থাক। তোমার কেন থাকবে?"
নিশি চুপ করে রইল। মেয়েটা ঠিক কথাই বলেছে। কিন্তু সমাজের বিচার এড়িয়ে চলা এত সহজ নয়।
কিছুদিন পর অফিসের এক সহকর্মীর মেয়ের বিয়ে ছিল। সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে। নিশিও গেল।
অনুষ্ঠান থেকে ফিরে শুনল, পাড়ায় কেউ বলেছে,
"বিধবা হয়ে আবার বিয়ে-শাদিতে ঘুরে বেড়ায়!"
সেদিন নিশি আর কষ্ট পেল না। শুধু অবাক হলো। একজন মানুষ কী পরবে, কোথায় যাবে, কখন হাসবে, এসব নিয়েও এত বিচার হতে পারে!
রাতে মিশি মায়ের পাশে বসে বলল,
"মা, মানুষ এত কথা বলে কেন?"
নিশি অনেকক্ষণ ভেবে বলল,
"যার জীবন নিয়ে তারা কিছুই জানে না, সেই জীবন নিয়েই মানুষ সবচেয়ে বেশি কথা বলে।"
মিশি মাথা নেড়ে মায়ের কাঁধে মাথা রাখল,
"তুমি শুধু আমাদের মতো করে বাঁচো। সবাইকে খুশি করতে যেও না।"
সেই রাতে নিশি বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। অভিকের কথা মনে পড়ছিল।
মনে হচ্ছিল, এত বছর পর সে অন্তত একটা জিনিস শিখেছে।
মানুষের বিচার কখনো শেষ হয় না। আজ এক কারণে বলবে, কাল আরেক কারণে বলবে। তাই নিজের জীবনটা অন্যের কথামতো নয়, নিজের বিবেক মতো বাঁচাই ভালো।
তারপর থেকে নিশি একটা নিয়ম করে নিল। সে আর কারও কথার জবাব দিতে যাবে না। যেখানে সম্মান নেই, সেখানে যাবে না। যেখানে প্রশ্নটা তার পোশাক নিয়ে, চরিত্র নিয়ে, সেখানে সে চুপ করে সরে আসবে না, শান্ত গলায় বলবে, "এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।"
নিশি সেদিন আর কাউকে জবাব দেয়নি। সে শুধু নিজের মতো করে বাঁচা চালিয়ে গেছে।
কারণ সে বুঝে গেছে, সমাজের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।
কিন্তু নিজের কাছে সৎ থাকা যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।