বাল্যবিবাহের চক্র
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
কিশোরী, দারিদ্র্য ও একটি ভুল হিসাব
বিশ্লেষণধর্মী। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেয়েটা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। বাবার ছোট মুদি দোকান। সংসারে অভাব আছে, তবে একেবারে না খেয়ে থাকার মতো নয়। মেয়েটি পড়াশোনায় ভালো। স্কুল থেকে ফিরেই বই খুলে বসে। মাঝে মাঝে শিক্ষকেরা বাবাকে ডেকে বলেন, মেয়েটাকে পড়ান, ওর মাথা ভালো।
কিন্তু এক সন্ধ্যায় পাশের বাড়ির এক আত্মীয় এসে বললেন, ভালো সম্বন্ধ পাওয়া গেছে। বাবা চুপ করে রইলেন। মা বললেন, ‘‘মেয়ের বয়সও তো কম হলো না।’’ কথাটা শুনে মেয়েটি পাশের ঘরে বসে বই বন্ধ করে দিল।
এমন দৃশ্য আমাদের সমাজে অচেনা নয়। বিয়েটা হয়ে গেলেই বাবা-মায়ের মনে হয়তো একটা বড় বোঝা নেমে যায়। মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা থাকবে না, পড়াশোনার খরচ থাকবে না, সমাজের কথাও শুনতে হবে না। দরিদ্র পরিবারের কাছে এই স্বস্তিটা কখনো কখনো খুব বাস্তব। কিন্তু হিসাবটা সেখানেই শেষ হয় না। বরং সেখান থেকেই অন্য একটি হিসাব শুরু হয়।
বাল্যবিবাহ নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত মেয়েটির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব এবং অকাল মাতৃত্বের ঝুঁকির কথা বলি। এগুলো সত্যি। কিন্তু এর আরেকটি দিক আছে, যেটা নিয়ে আমাদের একটু থামা দরকার।
একটি দরিদ্র পরিবার যখন মেয়ের বিয়ে দেয়, তারা কি সত্যিই দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উত্তরটা এত সহজ নয়। কারণ বিয়ের পর মেয়েটি এমন একটি সংসারে যায়, যেখানে অর্থনৈতিক অবস্থাও অনেক সময় খুব শক্ত নয়। স্বামী হয়তো দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক কিংবা স্বল্প বেতনের চাকরিজীবী। শুধু দুটো পরিবারের সম্পর্ক হয় না, অভাবটাও এক ঘর থেকে আরেক ঘরে চলে যায়।
তারপর আসে সন্তান। একজন তরুণী যে বয়সে নিজের শিক্ষা শেষ করার কথা, সে বয়সেই মা হয়ে যায়। নিজের আয় নেই। স্বামীর আয় সীমিত। ঘরের খরচ আছে, শিশুর দুধ আছে, ওষুধ আছে। কিছুদিন পর স্কুলের খরচও আসবে। যে পরিবারটি ভেবেছিল মেয়েকে বিয়ে দিলে একটি খরচ কমবে, তারা হয়তো দেখতে পায়—খরচ কমেনি, বরং জীবনের হিসাবটাই বদলে গেছে।
এখানে একটা অস্বস্তিকর সত্য আছে। দারিদ্র্য শুধু কম টাকা থাকার নাম নয়। দারিদ্র্য মানে অনেক সময় ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করার সুযোগ হারিয়ে ফেলা।
একটি মেয়েকে আরও কয়েক বছর পড়ানো মানে আজ কিছু খরচ করা। কিন্তু সেই পড়াশোনা ভবিষ্যতে তার নিজের আয় করার পথ খুলে দিতে পারে। অথচ দরিদ্র পরিবারের কাছে ভবিষ্যৎ অনেক সময় আজকের প্রয়োজনের কাছে হেরে যায়।
আজ ঘরে চাল লাগবে। আজ বাবার ওষুধ লাগবে। আজ দোকানের মাল কিনতে হবে। আগামী পাঁচ বছর পর মেয়েটি কী আয় করবে—সেটা তখন অনেক দূরের হিসাব।
এই জায়গায় বাল্যবিবাহকে শুধু বাবা-মায়ের ভুল সিদ্ধান্ত বলে দিলে সমস্যাটার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। সিদ্ধান্তটি তৈরি হয় অভাব, সামাজিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার ভেতর থেকে।
তবু সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয় দীর্ঘদিন। মেয়েটি পড়াশোনা শেষ করতে পারে না, কোনো পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায় না, নিজের আয় করার পথ তৈরি করতে পারে না। সংসারে তার শ্রমের মূল্য থাকে, কিন্তু সেই শ্রমের বিনিময়ে তার হাতে কোনো আয় আসে না।
অথচ একজন শিক্ষিত ও আয়ক্ষম নারী শুধু নিজের জীবন নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থাও বদলে দিতে পারেন। তার আয় সংসারের খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের পড়াশোনায় কাজে লাগে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবার একটু বড় করে ভাবতে পারে।
বাল্যবিবাহ অনেক সময় সেই সম্ভাবনাটাই শুরু হওয়ার আগেই থামিয়ে দেয়।
তারপর আসে দ্বিতীয় প্রজন্ম। কম আয়ের সংসারে সন্তান জন্মায়। বাবা-মায়ের শিক্ষার সীমাবদ্ধতা থাকে, অর্থের সীমাবদ্ধতা থাকে। সন্তানের পড়াশোনার ক্ষেত্রেও সেই সীমাবদ্ধতা চলে আসে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থাকলেও খরচ জোগাড় করা যায় না। একসময় সন্তান কম দক্ষতার কাজে ঢোকে, আয়ও সীমিত থাকে।
এভাবেই দারিদ্র্য কোনো কাগজপত্র ছাড়াই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে যায়।
এই কারণেই বাল্যবিবাহকে শুধু সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা দেখা হয় না। এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং পারিবারিক দারিদ্র্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তাই সমাধানও শুধু বিয়ে ঠেকানো নয়। মেয়েটি যেন স্কুলে থাকতে পারে, নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে, দরিদ্র পরিবার যেন তার পড়াশোনার খরচ চালাতে পারে এবং প্রয়োজনে কারিগরি বা পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়—এসবও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত বদলানো কঠিন, যেটির পেছনে বছরের পর বছর অভাব ও ভয় কাজ করে।
সবচেয়ে বড় কথা, মেয়েকে বিয়ে দেওয়া কোনো পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে পারে না।
আমরা অনেক সময় মেয়ের বিয়ের দিনটিকে বাবা-মায়ের দায়িত্ব শেষ হওয়ার দিন হিসেবে দেখি। কিন্তু একটু অন্যভাবে দেখলে প্রশ্নটা বদলে যায়—
সেদিন কি সত্যিই একটি দায়িত্ব শেষ হয়, নাকি একটি নতুন দারিদ্র্যের শুরু হয়?
মেয়েটির হাতে সেদিন হয়তো বই থাকার কথা ছিল। আমরা তার হাতে তুলে দিই বিয়ের চুড়ি।
তারপর বহু বছর পর যখন তার নিজের মেয়েটিও একই বয়সে পৌঁছে যায়, তখন আমরা দেখি—
একই ভয়।
একই অভাব।
একই তাড়া।
একই বিয়ে।
এই পুনরাবৃত্তিটাই আসলে বাল্যবিবাহের চক্র।
আর এই চক্র ভাঙার প্রথম কাজ হয়তো খুব কঠিন কিছু নয়—একটি মেয়েকে তার শৈশবটুকু ফিরিয়ে দেওয়া।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।