দরিদ্ররা কেন সাহিত্যচর্চায় পিছিয়ে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। এপ্রিল ২৫, ২০২৬
সন্ধ্যা নামার আগেই কাজ গুটিয়ে ফেলতে চায় ছেলেটা। দিনভর পরিশ্রমে হাত যেন একটু ভারী হয়ে থাকে। তবু ফেরার পথে সে থামে—একটা পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে। ভেতরে ঢোকে না। শুধু তাকিয়ে থাকে। দেখে মনে হয়, বইগুলোর সঙ্গে তার একটা দূরত্ব আছে—খুব বেশি নয়, কিন্তু পেরোনোর মতোও সহজ নয়।
আমরা প্রায়ই বলি, দরিদ্ররা সাহিত্যচর্চায় পিছিয়ে। কথাটা নিরপেক্ষ শোনায়, যেন একটা পর্যবেক্ষণ মাত্র। কিন্তু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এর মধ্যে একটা অঘোষিত অনুমান কাজ করে—যেন চেষ্টা ছিল, কিন্তু সফলতা আসেনি।
প্রশ্নটা অন্যভাবে তোলা যায়। পিছিয়ে পড়া কি তাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতার ফল, নাকি এমন কিছু শর্ত আছে যা শুরু থেকেই তাদের গতিকে কমিয়ে দেয়? নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন, তবে কিছু লক্ষণ ইঙ্গিত করে—সমস্যাটা হয়তো ব্যক্তির চেয়ে বড়।
সাহিত্যচর্চাকে আমরা অনেক সময় ব্যক্তিগত প্রতিভার বিষয় হিসেবে দেখি। কিন্তু একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়, সময়, পরিবেশ, সুযোগ—এই জিনিসগুলো ছাড়া সেই প্রতিভা টিকে থাকে না। দরিদ্র মানুষের জীবনে এই উপাদানগুলোর ঘাটতি প্রায়ই চোখে পড়ে।
ধরা যাক একটা পরিবার, যেখানে বই আলাদা করে রাখার জায়গা নেই। গল্প আছে, কিন্তু তা বইয়ের পাতায় নয়—দিনযাপনের অভিজ্ঞতায়। সেই পরিবেশে বড় হওয়া শিশুর কাছে সাহিত্য ধীরে ধীরে দূরের কোনো জিনিস হয়ে ওঠে। অপ্রয়োজনীয় নয়, তবে জরুরিও নয়। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটাই হয়তো পরে বড় হয়ে দাঁড়ায়।
সময়ও এখানে একটা ফ্যাক্টর, যেটা প্রায়ই আমরা সরলভাবে দেখি। সাহিত্যচর্চা মানে শুধু পড়া বা লেখা নয়; একটু থামা, ভাবা, নিজের সঙ্গে থাকা। কিন্তু যাদের দিন শুরু হয় কাজ দিয়ে এবং শেষ হয় ক্লান্তিতে, তাদের জন্য এই বিরতি তৈরি করা সহজ না। দিনের শেষে শব্দের সঙ্গে লড়াই করার মতো শক্তি কতটা অবশিষ্ট থাকে—সেটা প্রশ্ন থেকেই যায়।
অর্থনৈতিক দিকটা এখানে নিঃশব্দে কাজ করে। বই কেনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, এমনকি অবসর সময় তৈরি করা—এসবই একধরনের ব্যয়। আয় যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে এই ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সাহিত্য ধীরে ধীরে সরে যায় জীবনের প্রান্তে।
এখানে প্রায়ই একটা যুক্তি তোলা হয়—দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেও তো অনেকে বড় লেখক হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় -এর নাম আসতে পারে। যুক্তিটা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার, এই ধরনের উদাহরণগুলো বিরল। এগুলো সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে সীমাবদ্ধতার কথাও বলে—কত কম মানুষ সেই পথ পেরোতে পারে।
তাই সমস্যাটাকে ব্যক্তিগত সক্ষমতার জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখলে হয়তো পুরোটা ধরা পড়ে না। কাঠামোগত কিছু বিষয় এখানে কাজ করছে—এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
মিডিয়া ও প্রকাশনার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। প্রধান জাতীয় দৈনিকগুলোর সাহিত্য পাতায় যে অভিজ্ঞতাগুলো বেশি উঠে আসে, সেগুলো প্রায়ই মধ্যবিত্ত জীবনের কাছাকাছি। প্রান্তিক মানুষের গল্প থাকে, তবে সেগুলো সবসময় তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। অভিজ্ঞতা উপস্থিত, কণ্ঠ কিছুটা অনুপস্থিত—এমন একটা অনুভূতি থেকে যায়।
এখানে এসে মানসিক দিকটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে অনুপস্থিত অবস্থায় দেখতে দেখতে কেউ যদি ধরে নেয়—এই জগতটা তার জন্য নয়—তাহলে সেটা একেবারে অস্বাভাবিক না। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি অনেক সময় বাইরের কাঠামোর প্রতিফলন।
এই অবস্থায় প্রশ্নটা বদলানো দরকার বলে মনে হয়। “কেন পারে না”—এই প্রশ্ন হয়তো সমস্যাকে সংকুচিত করে ফেলে। বরং “কীভাবে সুযোগ তৈরি করা যায়”—এই দিকটা বেশি কার্যকর।
সুযোগ তৈরি করা শুনতে সহজ, কিন্তু বাস্তবে সেটা ধীরে গড়ে ওঠা একটা পরিবেশের বিষয়।
প্রথমেই আসে অ্যাক্সেস। বই না থাকলে সাহিত্যচর্চা শুরু করা কঠিন—এটা খুব সাধারণ পর্যবেক্ষণ। ছোট পরিসরে হলেও বইয়ের উপস্থিতি জরুরি। একটা কোণে কিছু বই, যেগুলো হাতে নেওয়া যায়—এটাই অনেক সময় শুরু।
সময় নিয়ে ভাবতে গেলে আরেকটু সতর্ক হতে হয়। সময় যেন কোথাও পড়ে থাকে না; বরং সেটাকে বানাতে হয়। অল্প সময় হলেও নিয়মিত হলে তার প্রভাব আলাদা হয়। হয়তো সপ্তাহে কয়েকবার, অল্প সময়ের জন্য—কিন্তু ধারাবাহিক।
আগ্রহের প্রশ্নটা একটু জটিল। বাইরে থেকে চাপিয়ে দিলে সেটা টেকে না। মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে শুরু করলে বিষয়টা বদলায়। যে ছেলেটা বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তার দিনটাও একটা গল্প হতে পারে—এই ধারণাটা গুরুত্বপূর্ণ।
লেখা যদি কোথাও পৌঁছায় না, তাহলে ধীরে ধীরে তা থেমে যায়। তাই কোনো না কোনো প্ল্যাটফর্ম দরকার। ছোট একটা অনলাইন গ্রুপ, সীমিত পরিসরের কোনো প্রকাশনা—এই জায়গাগুলো থেকেই শুরু হতে পারে।
মানসিক বাধা ভাঙা সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ। “এটা আমাদের জন্য না”—এই ধারণা রাতারাতি বদলায় না। তবে অন্য কাউকে একই জায়গা থেকে উঠে আসতে দেখলে কিছুটা পরিবর্তন আসে—এমনটা প্রায়ই দেখা যায়।
প্রযুক্তি এখানে কিছু সুযোগ এনে দিয়েছে। স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না; গল্প বলা, লেখা, শেয়ার করা—এসবও সম্ভব। এই প্রবেশগম্যতা আগে এত সহজ ছিল না।
এই পুরো প্রক্রিয়াটা একা চালানো কঠিন। কয়েকজন মিলে কাজ করলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হয়। ছোট টিম, সীমিত কাজ—কিন্তু নিয়মিত।
সাহিত্যচর্চাকে আমরা প্রায়ই বিলাসিতা হিসেবে দেখি—হয়তো অজান্তেই। এর ফলে কিছু মানুষ শুরু থেকেই বাইরে থেকে যায়। দরিদ্র মানুষ পিছিয়ে—এই কথাটা পুরোটা বোঝায় না। বরং মনে হয়, তারা এমন এক কাঠামোর মধ্যে আছে যেখানে পথটা শুরু থেকেই কিছুটা সংকীর্ণ।
প্রতিভা কোথায় জন্মায়, সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। কিন্তু সেটা বেড়ে ওঠার জন্য কিছু শর্ত দরকার—এইটুকু বলা যায়।
আমাদের ভূমিকা খুব বড় কিছু না। কিন্তু যদি ছোট পরিসরে কিছু জায়গা তৈরি করা যায়—যেখানে পড়া যায়, লেখা যায়, বলা যায়—তাহলে পরিবর্তন আসবেই।
ধীরে হোক, বা দ্রুত—জায়গা তৈরি হলে পরিবর্তন আসবেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।