জন্মভূমি আর বাসভূমির মাঝে এক সাহিত্যিক চেতনা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলম | মার্চ ০১,২০২৬
লন্ডনের ইস্ট হ্যামের এক ছোট ক্যাফে। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ভেতরে এক তরুণী ল্যাপটপ খুলে লিখছে। ফোনে তার মা বলছিলেন, “তুই বাংলায় ঠিকমতো লিখতে পারিস না কেন?” সে একটু থেমে কফির কাপ নামিয়ে টাইপ করে—
“আমি বাংলায় পুরোটা ভাবতে পারি না, কিন্তু আমার দুঃখ সবসময় বাংলাতেই ফিরে আসে।”
এই এক বাক্যের ভেতরেই তার দ্বিধা, তার অবস্থান।
নিউইয়র্কের কুইন্সে, সন্ধ্যার ভিড়ে এক তরুণ কবি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছে—
“আমার নামের উচ্চারণে যে ভুল, সেখানেই আমার ইতিহাস লুকানো।”
আরেক জায়গায় সে লিখেছে, “আমি দুই ভাষার মাঝখানে জন্মেছি—একটা আমাকে শিখিয়েছে বাঁচতে, আরেকটা শিখিয়েছে মনে রাখতে।”
এই উদ্ধৃতিগুলো কেবল আবেগ নয়। এগুলো প্রজন্মগত সত্য।
লন্ডন বা নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি-আমেরিকান বা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণদের কাছে বাংলা কোনো সহজ, স্বতঃসিদ্ধ ভাষা নয়। সেটা শেখা—বাড়ির ভেতর, সাপ্তাহিক পাঠশালায়, দাদির গল্পে। ইংরেজি তাদের স্কুলের ভাষা, কাজের ভাষা, স্বপ্নের ভাষা। বাংলা তাদের স্মৃতির ভাষা, পরিবারের ভাষা, অপরাধবোধের ভাষা।
ফলে তারা লিখছে এক নতুন মিশ্র রূপে। সেখানে বাংলা বাক্যের ভেতর ইংরেজি ভাব, ইংরেজি বাক্যের ভেতর বাংলা আবেগ। অনেকে একে “আধা-ভাষা” বলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটা কি সত্যিই আধা?
ভাষা তো কেবল ব্যাকরণ নয়। ভাষা অভিজ্ঞতার ধারক। যদি অভিজ্ঞতাই দ্বৈত হয়, তবে ভাষাও কি একক হতে পারে?
সমালোচনা আছে। প্রশ্নও আছে।
“এইভাবে বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে লেখা কি ভাষাকে বিকৃত করছে না?”
প্রথম দৃষ্টিতে আপত্তিটা যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। ভাষার শুদ্ধতা, ঐতিহ্য, গঠন—এসবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, কোনো ভাষাই স্থির নয়। বাংলা নিজেই সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি প্রভাবের ভেতর দিয়ে আজকের রূপ পেয়েছে।
যদি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্র বদলায়, অভিজ্ঞতা বদলায়, তবে প্রকাশভঙ্গিও বদলাবে। প্রশ্নটা তাই “নষ্ট” হওয়ার নয়; প্রশ্নটা হলো—এই রূপটি কি অভিজ্ঞতার প্রতি সৎ?
যদি এই মিশ্র ভাষা কেবল ফ্যাশন হয়, তবে তা টিকবে না। কিন্তু যদি তা বাস্তব জীবন থেকে উঠে আসে—নামের ভুল উচ্চারণ, স্কুলের বর্ণবাদী ঠাট্টা, বাড়িতে মায়ের কান্না—তবে তা সাহিত্য হয়ে থাকবে।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা এখন ছয় লক্ষেরও বেশি। বিশেষ করে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় এই সম্প্রদায়ের ঘনত্ব চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রেও নিউইয়র্ক শহরকে কেন্দ্র করে দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী।
এই বিপুল জনসংখ্যার দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, লেখালেখি করছে, নাটক বানাচ্ছে, কবিতা আবৃত্তি করছে। তাদের অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই আলাদা। তারা জন্মগতভাবে প্রবাসী। তাদের জন্য “ফেরা” কোনো বাস্তব বিকল্প নয়; কারণ তারা যেখানেই ফিরুক, সেটাই তাদের প্রথম ঘর নয়।
এই সংখ্যাই প্রমাণ করে—এটা ক্ষণস্থায়ী প্রবণতা নয়। এটা এক দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক রূপান্তর।
প্রবাসে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশ প্রায়ই গল্পে-শোনা। ছুটিতে যাওয়া, বিয়ের অনুষ্ঠান, গরমের বিদ্যুৎবিহীন রাত। কিন্তু তাদের বাস্তব দিনযাপন—স্কুল, কাজ, বন্ধু, প্রেম—সবই পশ্চিমা নগরজীবনের ভেতর।
ফলে দেশ হয়ে ওঠে দ্বৈত অভিজ্ঞতা।
একদিকে উত্তরাধিকার—ভাষা, ধর্ম, রান্না, পারিবারিক মূল্যবোধ।
অন্যদিকে নাগরিক বাস্তবতা—পাসপোর্ট, আইন, পেশা, সামাজিক কাঠামো।
এই দ্বন্দ্বই নতুন সাহিত্যের কাহিনি তৈরি করছে। যেখানে “আমি কোথায় আপন?” প্রশ্নটি কোনো নাটকীয় সংলাপ নয়; বরং প্রতিদিনের নীরব চিন্তা।
রাত সাড়ে দশটা। নিউইয়র্কের একটি অ্যাপার্টমেন্ট। মা রান্নাঘরে ডাল নাড়ছেন। ছেলে পাশের ঘরে অনলাইন মিটিং শেষ করে ঢুকেছে।
মা বলেন, “বাংলায় কথা বলো।”
ছেলে একটু থেমে উত্তর দেয়, “আমি চেষ্টা করছি।”
তার উচ্চারণে টান, শব্দে দ্বিধা। কিন্তু চোখে অপরাধবোধ।
এই ছোট দৃশ্যটাই মাঝভাষার জন্মভূমি। এখানে ভাষা কোনো সাহিত্যিক প্রকল্প নয়; বরং সম্পর্ক বাঁচানোর প্রয়াস।
এই অন্তর্বর্তী সাহিত্য তিনটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে—
প্রথমত, বাংলা সাহিত্যের ভৌগোলিক সীমানা ভেঙে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পরিচয়কে একক নয়, বহুমাত্রিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।
তৃতীয়ত, ভাষাকে জীবন্ত পরীক্ষাগারে পরিণত করছে।
এই ধারার পূর্বসূরি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে আমরা দেখেছি বা –এর কাজ। তবে নতুন প্রজন্মের পার্থক্য হলো—তারা আর কেবল অভিবাসনের গল্প বলছে না; তারা জন্মগত প্রবাসের গল্প বলছে।
হয়তো এই সাহিত্য নিখুঁত নয়। হয়তো বাক্য কখনো কাঁপে। উচ্চারণে টান থাকে।
কিন্তু জীবনও তো নিখুঁত নয়।
যে তরুণী লন্ডনের ক্যাফেতে বসে লিখছে, যে তরুণ কুইন্সের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের নামের ভুল উচ্চারণ নিয়ে কবিতা পড়ছে—তারা ভাষা নষ্ট করছে না। তারা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখছে তাদের মতো করে।
হয়তো মাঝখানেই তাদের ঠিকানা।
আর সেই মাঝখানের গল্পই আগামী দিনের বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মানবিক অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
#মাঝভাষা #ডায়াসপোরা_সাহিত্য #প্রবাসী_পরিচয় #নতুন_বাংলা #অন্তর্বর্তী_সত্তা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।