সরে গেলেই চেনা যায়
(সম্পর্ক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা |
২৩ অক্টোবর ২০২৬
সরে গেলেই চেনা যায়—কথাটা বুঝতে খুব বড় কোনো ঘটনার দরকার হয় না। পরিবারের কোনো অনুষ্ঠানে সবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া একজন মানুষকে দেখলেই অনেক সময় বিষয়টা বোঝা যায়।
ধরা যাক, সেই মানুষটি একজন মামা। বাড়িতে অনুষ্ঠান হলে তিনি সবার আগে কাজে নেমে পড়েন। বাজার করা, অতিথিদের খোঁজ নেওয়া, কে খেয়েছেন আর কে খাননি—সবকিছুতেই তাঁর নজর থাকে। নিজের খাওয়াটা ঠান্ডা হয়ে গেলেও অন্যদের অসুবিধা হতে দেন না।
অনুষ্ঠান শেষে সবাই বাড়ি ফেরে। পরদিন থেকে আবার যে যার কাজে ব্যস্ত। মামার কথা আর কারও মনে পড়ে না। অথচ পরের অনুষ্ঠানেও সবাই ধরে নেয়, তিনি আগের মতোই সব সামলে নেবেন।
একবার অসুস্থতার কারণে তিনি দায়িত্ব নিতে পারলেন না। তখনই অভিযোগ উঠল, মানুষটা নাকি বদলে গেছেন। কেউ একবারও জানতে চাইল না, তাঁর শরীরটা কেমন।
এমন ঘটনা আমাদের চারপাশে কম নেই। যে মানুষটি সবার প্রয়োজনে পাশে থাকে, তার নিজের প্রয়োজন দেখা দিলে অনেক সম্পর্কের আসল চেহারা বেরিয়ে আসে।
মানুষের অনুপস্থিতি অনেক সময় তার উপস্থিতির চেয়ে বেশি সত্য প্রকাশ করে।
যে বন্ধু বিপদে পড়লে সবার আগে ছুটে আসে, সে নিজে বিপদে পড়লে কারা পাশে দাঁড়ায়, তা দেখা যায়। যে মানুষটি প্রতিদিন ফোন করে সবার খোঁজ নেয়, সে একদিন ফোন করা বন্ধ করলে বোঝা যায়, সম্পর্কটা এত দিন কার চেষ্টায় চলছিল।
কষ্টটা শুধু সাহায্য না পাওয়ার নয়। কষ্টটা হলো, যাদের আপন ভেবেছিলেন, তাদের কাছে নিজের জায়গাটা কতটা শর্তসাপেক্ষ ছিল, তা বুঝতে পারা।
আমরা অনেক সময় মানুষটিকে নয়, তার কাছ থেকে পাওয়া সুবিধাগুলোকে ভালোবেসে ফেলি। কেউ আমাদের সময় দেয়, বিপদে অর্থ দিয়ে সাহায্য করে, মন খারাপের কথা শোনে। এসব করতে করতে সে একসময় আমাদের কাছে অভ্যাস হয়ে ওঠে। তখন ভুলে যাই, তারও ক্লান্তি আছে, তারও কখনো কারও পাশে বসে নিজের কষ্ট বলার প্রয়োজন হয়।
একদিন সে ফোন করে বলল, ‘আজ মনটা ভালো নেই, একটু কথা বলবি?’
ওপাশ থেকে উত্তর এল, ‘আজ একটু ব্যস্ত আছি রে, পরে কথা বলি।’
পরে আর ফোন এল না।
একটি ঘটনা দিয়ে সম্পর্ক বিচার করা যায় না। মানুষের ব্যস্ততা থাকে, নিজের সমস্যাও থাকে। কিন্তু বারবার এমন হলে প্রশ্ন জাগে—এই সম্পর্কের মধ্যে আমার জন্যও কি কোনো জায়গা আছে?
কিছু মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। প্রথমে অভিযোগ করে, অভিমান দেখায়, বোঝানোর চেষ্টা করে। তারপর একসময় চুপ হয়ে যায়। আগে যে কথায় কষ্ট পেত, সেটার উত্তর দেওয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলে।
বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক মনে হয়। অন্যরা ভাবে, মানুষটা বুঝি বদলে গেছে।
আসলে সে হয়তো আর বোঝানোর শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না।
শরীরটা শুধু পরে সরে যায়।
কেউ দূরে সরে গেলেই তাকে স্বার্থপর বলা যায় না। আবার দূরত্ব তৈরি করলেই কেউ নির্দোষ হয়ে যায়, এমনও নয়। ভুল বোঝাবুঝি হলে কথা বলা দরকার, নিজের ভুল থাকলে তা স্বীকার করাও জরুরি। কিন্তু সম্পর্ক বাঁচানোর দায় যদি বারবার একজনের কাঁধেই পড়ে, তাহলে একসময় তার থেমে যাওয়াও স্বাভাবিক।
একটু থামলে অনেক কিছু বোঝা যায়। আপনি আগের মতো ফোন না করলে কে খোঁজ নেয়, বিপদে পড়লে কে সময় বের করে, কোনো প্রয়োজন না থাকলেও কে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়—এসব ছোট বিষয়ের মধ্যেই সম্পর্কের অনেক উত্তর লুকিয়ে থাকে।
তবে কেউ খোঁজ নিল কি না, শুধু তা দিয়ে ভালোবাসার মাপ নেওয়া যায় না। কেউ অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না, কেউ দূরে থেকেও আন্তরিক থাকে। তাই এক দিনের নীরবতা নয়, দীর্ঘদিনের আচরণ দেখতে হয়।
একইভাবে, আপনি সরে যাওয়ার পর কেউ ফিরে এলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে সে আপনাকে বুঝেছে। সে কি নিজের ভুল স্বীকার করেছে? আপনার কষ্টের কথা শুনেছে? নাকি আগের মতো সুবিধা না পাওয়াটাই তাকে অস্থির করে তুলেছে?
এই পার্থক্য কথায় নয়, আচরণে বোঝা যায়।
কেউ আপনাকে হারাতে চায় না বলেই যে আপনাকে ভালো রাখতে চায়, তা নয়।
জীবনে এমন মানুষও থাকে, যারা আপনার অভাব বুঝতে দেরি করে। আপনি পাশে থাকতে থাকতে তারা ধরে নেয়, আপনি কোথাও যাবেন না। আপনার সময়, শ্রম আর ভালোবাসাকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। পরে আপনি সরে গেলে হয়তো বুঝতে পারে, ছোট ছোট কাজগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আবার কেউ কোনো দিনই বুঝবে না।
এই সত্যটা মেনে নেওয়া কঠিন, বিশেষ করে যখন মানুষগুলো নিজের হয়। বাইরের কারও অবহেলার চেয়ে আপনজনের কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার অনুভূতি অনেক বেশি কষ্ট দেয়। সেখানে শুধু সম্পর্ক থাকে না, থাকে বহু বছরের স্মৃতি, অভ্যাস আর বিশ্বাস।
তবু সবাইকে ধরে রাখতে গিয়ে নিজের শান্তি বিসর্জন দেওয়া যায় না। কাউকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি আচরণ মেনে নেওয়া নয়। নিজের সীমা নির্ধারণ করাও সম্পর্কের প্রতি অসততা নয়।
সেদিন হয়তো সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে চা খাবেন। ফোনটা পাশে পড়ে থাকবে। পুরোনো অভ্যাসে একবার ফোনটা হাতে নেবেন, তারপর আবার রেখে দেবেন। কারও খোঁজ নেওয়ার তাড়া থাকবে না, কাউকে নিজের কষ্ট বোঝানোর চেষ্টাও করতে হবে না।
কষ্ট হবে। কিছু স্মৃতি ফিরে আসবে। তবু ধীরে ধীরে নিজের সময়টুকু নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে শিখবেন।
হয়তো তখনও সবার আচরণের ব্যাখ্যা পাবেন না। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হবে—যাদের জন্য এত দিন নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে কে আপনার নীরবতাটুকুও বুঝতে চেয়েছিল?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।