নিজের পাশে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৭ অক্টোবর ২০২৬
জীবনের কিছু পরিবর্তন খুব ধীরে আসে। এত ধীরে যে প্রথমে বোঝাই যায় না, কিছু একটা বদলে গেছে।
একদিন যে মানুষটা আমার ফোনের অপেক্ষায় থাকত, একসময় দেখি তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমাকে সময় খুঁজতে হচ্ছে। যে মানুষ আমার মুখ দেখেই বুঝে ফেলত মন খারাপ, একদিন তার সামনে বসে অনেক কথা বলেও মনে হয়, আমার কথাগুলো আর আগের মতো তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
তখন বুঝি, মানুষটা বদলে গেছে।
মানুষ বদলায়। পরিস্থিতি বদলায়। প্রয়োজন বদলায়। কখনো সম্পর্কের দূরত্বও বাড়তে থাকে, অথচ ঠিক কখন থেকে সেটা শুরু হলো, কেউ বলতে পারে না।
সবচেয়ে কষ্ট হয় তখন, যখন মানুষটা বদলে যায়, কিন্তু আমি তাকে আগের জায়গাতেই ধরে রাখি।
আমরা কাছের মানুষদের নিয়ে একটা ভুল করি। আজ যে পাশে আছে, কালও থাকবে ধরে নিই। যে আমার কথা মন দিয়ে শুনছে, সে সবসময় শুনবে। যে আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তার জীবনে আমার জায়গাটাও একই থাকবে।
কিন্তু সম্পর্কের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
একসঙ্গে অনেকটা পথ হাঁটা মানেই শেষ পর্যন্ত পাশাপাশি হাঁটা নয়।
এই সত্যিটা মেনে নেওয়া কঠিন। কারণ আমরা শুধু মানুষকে ভালোবাসি না, তার উপস্থিতির সঙ্গেও অভ্যস্ত হয়ে যাই। প্রতিদিন কথা বলতে বলতে একসময় তার নীরবতাও অস্বাভাবিক লাগে। তখন মানুষটাকে হারানোর পাশাপাশি নিজের একটা অভ্যাস হারানোর ভয়ও কাজ করে।
সেখান থেকেই শুরু হয় নিজের সঙ্গে আপস।
একটা ফোনের অপেক্ষা।
একটা উত্তর পাওয়ার জন্য বারবার বার্তা পাঠানো।
আগের মতো কথা না বললে নিজের কোনো ভুল হয়েছে কি না, সেটা ভেবে অস্থির হওয়া।
অথচ কখনো কখনো সত্যিটা খুব সহজ।
মানুষটি আর আগের জায়গায় নেই।
কষ্ট হলেও এই সত্যিটা মেনে নেওয়া দরকার। কারণ কাউকে ধরে রাখার জন্য নিজের মর্যাদা বিসর্জন দিলে সম্পর্কটা হয়তো কিছুদিন টিকে থাকবে, কিন্তু নিজের ভেতরের শান্তিটা আর থাকবে না।
কাউকে প্রয়োজন হতে পারে। তার কাছে নিজের দুর্বলতার কথা বলা যায়। বিপদে সাহায্য চাওয়া যায়। নিজের কষ্ট ভাগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু নিজের পুরো পৃথিবীটা একজন মানুষের ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
কারণ মানুষ চলে যেতে পারে।
সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে।
কাছের মানুষ দূরে সরে যেতে পারে।
এমনকি যে একদিন বলেছিল, “আমি আছি”, সেও কোনো একদিন আর নাও থাকতে পারে।
এটা মেনে নেওয়া মানে মানুষের ওপর অবিশ্বাস করা নয়। বরং এর মানে হলো, কেউ পাশে থাকলে তাকে ভালোবাসব, তার উপস্থিতির মূল্য বুঝব; কিন্তু সে চলে গেলে নিজের জীবনটাকে থামিয়ে রাখব না।
নিজের প্রয়োজন নিজে সামলাতে পারা, নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারা, বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রাখা, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাইতে পারা—এসবও জীবনের বড় শক্তি।
আমরা শক্ত মানুষ বলতে অনেক সময় এমন কাউকে বুঝি, যে কারও সামনে কাঁদে না।
আমি তা মনে করি না।
শক্ত মানুষ সে, যে কাঁদে, ভেঙে পড়ে, তবু একসময় নিজেকে সামলে নেয়। যে হারানোর পরও পরদিন সকালে উঠে নিজের কাজ করে। যে জানে, একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া মানেই তার জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
একা থাকার প্রস্তুতি তাই একা হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা নয়।
আমি কাউকে হারানোর ভয় নিয়ে বাঁচতে চাই না। যারা আমার জীবনে আছে, তাদের ভালোবাসতে চাই, যত্ন করতে চাই। কিন্তু এটাও মনে রাখতে চাই, তাদের উপস্থিতি আমার জীবনের আনন্দ হতে পারে, আমার পুরো অস্তিত্বের একমাত্র ভিত্তি নয়।
আজ আমি কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কাল তার জীবনে নতুন কোনো মানুষ, নতুন কোনো দায়িত্ব, নতুন কোনো অগ্রাধিকার আসতে পারে।
তাতে আমার মূল্য কমে যায় না।
শুধু তার জীবনের হিসাব বদলে যায়।
জীবনের সব সম্পর্ক একই দূরত্বে থাকে না। কেউ বহু বছর পাশে থাকে, কেউ আসে কিছুটা পথের জন্য। কেউ একসময় স্মৃতি হয়ে যায়। আবার কেউ চলে যাওয়ার পর বুঝিয়ে দেয়, নিজের পাশে দাঁড়াতে শেখাটাও জরুরি ছিল।
তাই মানুষকে ভালোবাসুন, বিশ্বাস করুন। শুধু নিজের ভেতরে এমন একটা জায়গা তৈরি করে রাখুন, যেখানে প্রয়োজন হলে নিজেই নিজের হাতটা ধরতে পারেন।
কারণ একদিন যদি চারপাশটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়, তখন অন্তত একজন যেন আপনার পাশে থাকে।
সেই মানুষটি আপনি নিজেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।