বন্ধুত্বের আসল
মানে
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প।১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
আজ তোমাদের শোনাই দুই বন্ধুর একটা ছোট্ট, কিন্তু গভীর গল্প। বন্ধুত্ব শব্দটা শুনতে যত ছোটই মনে হোক, তার গভীরতা কিন্তু অসীম। আর সত্যিকারের বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা—সেটা তো আরও কঠিন।
একবার দুই ছোটবেলার বন্ধু—রাহাত আর ফারহান—অফিসের ছুটিতে বেড়াতে গেল সমুদ্রের ধারে। সাগরের গর্জন, ঢেউয়ের ছলাৎছল শব্দ আর পায়ের তলায় নরম বালি—সব মিলিয়ে মনটা যেন আবার ছেলেবেলায় ফিরে গিয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে পুরনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেল। স্কুলে একসঙ্গে পড়া, ক্লাস পালিয়ে সিনেমা দেখা, পাড়ার রকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা, ক্রিকেট খেলে হাত-পা ছড়ে ফেলা—সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।
কথায় কথায় উঠে এলো সেই মেয়েটার প্রসঙ্গ। নাম ছিল রিয়া। ছোটবেলায় দুজনেরই মনটা একটু একটু করে তার জন্য কেঁপে উঠত। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তার সঙ্গে দুজনেরই যোগাযোগ হারিয়ে গিয়েছিল। সেই কথা উঠতেই দুজনে একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করল। কথা বাড়তে বাড়তে তর্ক, তর্ক বাড়তে বাড়তে ঝগড়া। রাগের মাথায় রাহাত হঠাৎ ফারহানের গালে একটা চড় কষিয়ে বসল।
চারদিকটা যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল। ঢেউয়ের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না। পথচারীরা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। দুজনেই মাথা নিচু করে চুপচাপ হাঁটতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়ে রাহাত একা বসে পড়ল একটা বড় পাথরের ওপর। দেখল, ফারহান বালির ওপর আঙুল দিয়ে লিখছে:
“আজ আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আমায় চড় মেরেছে।”
সময় গড়াতে লাগল। রাহাতের মনের রাগটা ধীরে ধীরে গলে যেতে শুরু করল। সে উঠে গিয়ে ফারহানের কাছে দাঁড়াল। চোখ নামিয়ে বলল,
“ক্ষমা করে দে। আমি ওভাবে হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে। তুই আমার কাছে সবচেয়ে দামি।”
ফারহান কিছু না বলে শুধু জড়িয়ে ধরল তাকে। দুজনের চোখেই জল। আবার হাসি ফিরে এলো ঠোঁটে। গল্প শুরু হয়ে গেল আগের মতোই।
কিছুক্ষণ পরই ঘটে গেল বিপদ। ফারহান অন্যমনস্ক হয়ে জলের একটু গভীরে চলে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা প্রকাণ্ড ঢেউ এসে তাকে আছড়ে ফেলল। ভারসাম্য হারিয়ে সে ডুবে যেতে লাগল। চিৎকার করে উঠল, “রাহাত!”
রাহাত দৌড়ে গেল। প্রাণপণ শক্তি দিয়ে ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে ফারহানকে টেনে তুলে আনল কিনারায়। দুজনে হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল পাথরের ওপর। অনেকক্ষণ পর ফারহানের শ্বাস স্বাভাবিক হলো।
রাহাত তখনও রাগে-উদ্বেগে কাঁপছে। বকতে লাগল, “এত অসতর্ক হলি কী করে? জানিস না জল কত বিপজ্জনেক?”
ফারহান শুধু হাসল। তারপর পাথরের ওপর আঙুল দিয়ে লিখল:
“আজ আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে।”
রাহাত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা কী করছিস তুই? একবার বালিতে, একবার পাথরে?”
ফারহান গভীর চোখে তাকাল। হেসে বলল,
“দেখ, যা খারাপ লাগা, যা আঘাত—সেগুলো বালিতে লিখি। ঢেউ আসবে, মুছে যাবে। কিন্তু যা ভালোবাসা, যা কৃতজ্ঞতা—সেগুলো পাথরে খোদাই করি। যেন চিরকাল থেকে যায়।”
তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগল,
“দোস্ত, আমরা এ পৃথিবীতে খালি হাতে এসেছি, খালি হাতেই চলে যাব। শেষমেশ কয়েকটা সম্পর্ক ছাড়া আর কিছুই থাকে না। ছোট ছোট রাগ, অভিমান মনে জমিয়ে রাখলে সম্পর্ক বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়। তাই প্রিয় মানুষদের সঙ্গে যা খারাপ স্মৃতি, সেগুলো এমন জায়গায় লিখে রাখি—যেখান থেকে সময়ের সঙ্গে মুছে যাবে। আর যা ভালো, যা উপকার, সেগুলো মনে গেঁথে রাখি। কঠিন সময়ে যেন সেগুলোই চোখে পড়ে। যেন দূরত্ব না বাড়ে। যেন বন্ধুত্বটা বেঁচে থাকে—পলকে পলকে।”
দুজনে আবার জড়িয়ে ধরল একে অপরকে। সাগরের ঢেউ তখন যেন তাদের বন্ধুত্বের গান গাইছে।
খারাপ স্মৃতিগুলো ঢেউয়ের সঙ্গে মুছে যাক।
ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা পাথরে খোদাই হয়ে থাকুক চিরকাল।
বন্ধুত্ব বেঁচে থাকুক—এই কামনা।
#বন্ধুত্ব #সত্যিকারেরবন্ধু #জীবনেরশিক্ষা #বন্ধুত্বেরগল্প #কৃতজ্ঞতা #ভালোবাসা #বাংলাগল্প #বন্ধুদেরজন্য #EmotionalStory #FriendshipGoals
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।