মোহরের বোঝা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩ নভেম্বর ২০২৬
বাবার বাড়িতে ফিরে আসার দিন মেয়েটির হাতে খুব বেশি কিছু ছিল না। একটি ব্যাগ, কিছু কাপড় আর বিয়ের সংসার থেকে নিয়ে আসা কয়েকটি স্মৃতি। যে বাড়িতে একসময় তার জন্য আলাদা একটি ঘর ছিল, সেই বাড়িতেই এখন তার নতুন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা।
বিয়েটা টেকেনি। তালাক হয়েছে। সন্তান নেই। নিজের কোনো চাকরি নেই, উপার্জনও নেই। বাবার সংসারে ফিরে এসে সে যেন নিজের জীবনটাকে আবার শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাবার শরীরই তখন তাকে সবচেয়ে বেশি অসহায় করে তুলেছে।
বাবার হৃদয়ে রিং বসানো হয়েছে। বাইপাস অস্ত্রোপচারও হয়েছে। তারপরও হৃদয়ের আরেকটি রক্তনালিতে শতভাগ ব্লক নিয়ে তিনি বেঁচে আছেন। কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। সংসার চালানোর সামর্থ্য নেই। নিজের চিকিৎসা আর দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেই তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
এই সংসারে মেয়েটি এখন আর শুধু মেয়ে নয়, সে নিজেও একজন অসহায় মানুষ। বাবার কাছে আশ্রয় পেয়েছে, কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার মতো কোনো অবলম্বন পায়নি।
তার বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহর ছিল। বিচ্ছেদের পর সেই অর্থ তার অধিকার। সেই অর্থ পেলে হয়তো বাবার সংসারে কিছুটা সাহায্য করতে পারত। নিজের জন্য ছোটখাটো একটি কাজ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পেত। অন্তত প্রতিদিন বাবার অসুস্থতার দিকে তাকিয়ে নিজের অসহায়ত্বের হিসাব করতে হতো না।
কিন্তু দেনমোহর আদায়ের পথটিও সহজ হয়নি।
নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সে একজন আইনজীবীর কাছে গিয়েছিল। বিশ্বাস করেছিল, তিনি তার হয়ে মামলা লড়বেন। ভরণপোষণের দাবি তুলে ধরবেন। আদালতে তার পাওনা আদায়ের চেষ্টা করবেন।
অভিযোগ রয়েছে, সেই আইনজীবী অধিক অর্থের বিনিময়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে মামলার স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছেন। অভিযোগটি সত্য হলে, এটি শুধু পেশাগত অনৈতিকতার বিষয় নয়, একজন অসহায় মানুষের বিশ্বাস ও অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রতারণা।
যে নারী নিজের সংসার হারিয়ে আইনকে শেষ আশ্রয় ভেবেছিলেন, তার কাছে এই অভিজ্ঞতা নতুন করে বিশ্বাস ভাঙার মতো। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবসান ঘটেছে, কিন্তু ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইও যদি অসৎ স্বার্থের কাছে আটকে যায়, তাহলে তার সামনে আর কী থাকে?
সেই অধিকার আদায় করতে গিয়ে একজন নারীকে যদি বারবার অসহায়ত্বের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রতি তার আস্থা কোথায় দাঁড়াবে?
এখানে মেয়েটির জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিকটি হলো, তার পাশে দাঁড়ানোর মতো আর্থিকভাবে সক্ষম কেউ নেই। বাবার নিজের চিকিৎসার খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য অর্থ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মেয়েটিও কর্মহীন। নিজের উপার্জন নেই বলে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সমাজ অবশ্য এসব হিসাব করে না। তার কাছে মেয়েটির পরিচয় খুব সহজ, তালাকপ্রাপ্তা।
এই একটি শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে যায় তার সংসার হারানোর ইতিহাস, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা, বাবার অসুস্থতার পাশে নীরবে বসে থাকার দিনগুলো। আত্মীয়স্বজনের কাছে সে হয়তো করুণার মানুষ, কারও কাছে অস্বস্তির বিষয়, আবার কারও কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত আলোচনার উপাদান।
অথচ সে তো কোনো অপরাধ করেনি।
একটি বিয়ে টেকেনি বলে একজন নারীর সারাজীবন থেমে থাকার কথা নয়। তালাকের পর তার কাজ করার অধিকার আছে, নতুন জীবন গড়ার অধিকার আছে, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। দেনমোহর আদায় করতে পারলে সেই জীবন গড়ার পথে একটি বাস্তব সহায়তা হতে পারত।
এই জায়গায় আইনজীবীর নৈতিক দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। মক্কেলের মামলা শুধু একটি ফাইল নয়। সেই ফাইলের ভেতরে থাকে কারও জীবনের পরিকল্পনা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। অর্থের বিনিময়ে সেই বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব আদালতের কক্ষের বাইরে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছায়।
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে এমন নারীদের জন্য আইনি সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা দরকার, যাতে তারা বিচ্ছেদের পর সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়েন।
বাবার ঘরে তার ব্যাগটি এখনো পড়ে আছে। ফাইলের কাগজে তার দেনমোহরের হিসাব লেখা আছে। কাগজে অধিকারটি এখনো আছে। শুধু সেই অধিকার থেকে যে নতুন শুরু হওয়ার কথা, সেটিই এখনো আসেনি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।