জীবনানন্দ দাশের নিঃসঙ্গতা আসলে একধরনের রোমান্টিকতাবাদ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
নিবন্ধ। এপ্রিল ০৩, ২০২৬
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নিঃসঙ্গতা প্রথম পাঠে ঘন অন্ধকারের মতো ঠেকে। কিন্তু পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে তার ভেতর থেকে একটা অন্যরকম সুর উঠে আসে। এই একাকীত্ব কোনো বিচ্ছিন্নতার কাহিনি নয়। বরং প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের নীরব, গভীর মিলনের অনুভূতি। এখানেই তাঁর রোমান্টিকতাবাদের ছাপ স্পষ্ট — যেখানে মানুষ সমাজের ভিড় ছেড়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে যায়, আর সেখানে নিজেকে হারানোর বদলে একটা নতুন অস্তিত্বের স্বাদ পায়।
“ধূসর পাণ্ডুলিপি” কিংবা “বনলতা সেন” খুললে দেখা যায়, কবি একা দাঁড়িয়ে থাকেন ধানক্ষেতের কিনারে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। সেখানে পেঁচার ডাক বা শালিকের ডানার শব্দ তাঁকে আলাদা করে রাখে না। বরং তাঁকে আরও নিবিড়ভাবে পৃথিবীর সঙ্গে জুড়ে দেয়। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে এই মৌন অবস্থান যেন তাঁর কাছে অনেক বেশি স্বাভাবিক।
ইংরেজি রোমান্টিক কবিদের মধ্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থ “আমি মেঘের মতো একা ঘুরে বেড়াতাম” কবিতায় একা হেঁটে চলা মানুষের মধ্যে প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে আনন্দ খুঁজে পান। জীবনানন্দও প্রকৃতিকে দেখেন। কিন্তু তাঁর চোখে সেটা ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো উজ্জ্বল আনন্দময় নয়। বাংলার মাটির গন্ধ, অন্ধকার আকাশ আর নদীর ধারের ঘাস — এসবের মধ্যে একটা নীরব, প্রায় নিরুদ্দেশ অনুভূতি। প্রকৃতি তাঁর কাছে শুধু পটভূমি নয়। সে যেন এক সঙ্গী, যার সঙ্গে মিশে যাওয়ায় কোনো ভয় নেই।
“বনলতা সেন” কবিতায় ক্লান্ত পথিকের দীর্ঘ যাত্রার পর “দু-দণ্ড শান্তি” পাওয়ার কথা আসে। “আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন”। এই শান্তি নিঃসঙ্গতারই একটা রূপ। সমাজ বা মানুষের ভিড় থেকে দূরে, একটা নারীর স্মৃতি বা প্রকৃতির আশ্রয়ে সাময়িকভাবে থেমে যাওয়া। বনলতা সেন কি সত্যিকারের নারী, নাকি কাল্পনিক আশ্রয়? এই প্রশ্নটি উঠে আসে। যদি কাল্পনিক হয়, তাহলে এই “শান্তি”ও কি শেষ পর্যন্ত এক ধরনের ভ্রম? তবু এই ভ্রমের মধ্যেই কবি একটা সাময়িক প্রশান্তি খুঁজে পান।
“আবার আসিব ফিরে” কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছেন:
“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে — এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে...”
এই লাইনগুলোতে মৃত্যুকে দেখা হয়েছে একটা চিরকালীন ফিরে আসার মতো। ঘাস হয়ে, পাখি হয়ে, প্রকৃতির অংশ হয়ে ফিরে আসা। এখানে নিঃসঙ্গতা শুধু জীবিত অবস্থায় নয়, মৃত্যুর পরেও প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যাওয়ার একটা ধারাবাহিকতা। তবে এই মিলনে একটা নাস্তিক্যের সুর স্পষ্ট। দেহের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার কোনো ভয় নেই, বরং সেটাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি জীবনানন্দকে নিহিলিজমের কাছাকাছি নিয়ে যায়, যেখানে অস্তিত্বের শূন্যতা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে বিলীন হয়ে যাওয়ার একটা শান্ত স্বীকারোক্তি।
রবীন্দ্রনাথের “একাকী” কবিতায় একাকীত্ব প্রায়শই আত্মার সঙ্গে ঈশ্বরের মিলনের দিকে ঝোঁকে। সেখানে একা থাকা মানে অন্তরের গভীরে ডুব দেওয়া। জীবনানন্দের একাকীত্ব আরও মাটি-ঘেঁষা। এটা প্রকৃতির শারীরিক উপস্থিতির সঙ্গে মিশে যাওয়া। সুকান্তের “ছাড়পত্র” কবিতায় নিঃসঙ্গতা বিদ্রোহী — সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে থাকা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য পথ ছেড়ে দেওয়া। জীবনানন্দেরটি সেখান থেকে সরে এসে প্রকৃতির নীরবতায় আশ্রয় নেয়।
এই নিঃসঙ্গতা তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে। কখনো অন্ধকারময়, কখনো মৌন প্রশান্তিতে ভরা। এটা আধুনিক জীবনের কোলাহল থেকে সরে এসে পুরনো বাংলার ধীর সময়ের কাছে ফিরে যাওয়ার একটা পথ।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় — জীবনানন্দের এই প্রকৃতি-মিলন কি শুধুই পলায়ন, নাকি প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে সেই অসীম, অপার্থিব অনুভূতির সন্ধান? তাঁর কবিতায় সেই উন্নীত অনুভূতি কতটা উপস্থিত, সেটা নিয়ে আরও ভাবার অবকাশ রয়েছে।
#জীবনানন্দদাশ #বাংলাকবিতা #রোমান্টিকতাবাদ #নিঃসঙ্গতা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।