একটা নজরে পথের পাঁচালী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। মে ১১, ২০২৬
পথের পাঁচালী-কে এক নজরে ধরতে গেলে প্রথমেই একটা জিনিস চোখে পড়ে—এখানে গল্প কোনো সরল রেখায় এগোয় না। ঘটনা আছে, কিন্তু ঘটনাই কেন্দ্র নয়। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট টুকরো অভিজ্ঞতা, মানুষের টিকে থাকার ভঙ্গি, আর তাদের ভেতরের টানাপোড়েন মিলিয়ে একটা গ্রাম ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ফলে চরিত্রগুলোকে আলাদা করে পড়লে আধখানা লাগে। পুরোটা বুঝতে হলে তাদের একসাথে বসাতে হয়—যেমন ছেঁড়া কাঁথার টুকরো পাশাপাশি না রাখলে নকশা চেনা যায় না।
অপু এই উপন্যাসে এমন এক চোখ, যেটা প্রথমবার পৃথিবীকে দেখছে। রেললাইনের দূরের শব্দ, মাঠের ওপর দিয়ে হাওয়ার কাঁপন, গ্রামের সরু পথের বাঁক—সবকিছু তার কাছে আলাদা আলাদা অর্থ তৈরি করে। সে দেখে, কিন্তু সাথে সাথে মানে বসায় না। দেখাটাই তার অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে, ব্যাখ্যা পরে আসে—কখনো আসে না-ও।
দুর্গা এই উপন্যাসে একধরনের বাতাস। ঘরের ভেতর আটকে থাকে না। কখনো উঠোনে দৌড়, কখনো নিষেধ ভেঙে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া—ঘরের চৌকাঠ তাকে ধরে রাখতে পারে না। ফল চুরি করা বা বৃষ্টিতে ভিজে ফেরা—এসব তার ভেতরের একটা অস্থির শক্তির প্রকাশ। কিন্তু এই ছুটে চলার ভেতরেই একটা থেমে যাওয়ার রেখা আছে, যেটা হঠাৎ কেটে যায়—কোনো ঘোষণা ছাড়া, যেন গল্প নিজেই বাক্য মাঝখানে কেটে দিয়েছে।
তার পরে যা থাকে, সেটা শব্দ করে না। অপু সেটা বুঝতে শেখে ধীরে ধীরে, কিন্তু সেই বোঝা কখনো সম্পূর্ণ হয় না।
সর্বজয়া-কে শুধু কঠোর মা হিসেবে পড়া খুব সহজ, কিন্তু অসম্পূর্ণ। তার চারপাশে প্রতিদিনের অভাব বসে থাকে—চাল নেই, টাকা নেই, নিশ্চিত কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই চাপের ভেতর দাঁড়িয়ে তার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
তার রাগ তাই আলাদা কোনো ঘটনা নয়। সেটা ক্লান্তির শরীরী রূপ। সে মেয়েকে বকছে, কিন্তু সেই বকা আসলে টিকে থাকার একটা উপায়। ভালোবাসা এখানে শব্দে নয়, অভ্যাসের ভাঁজে আটকে থাকে—হাঁড়ি নামানোর শব্দে, চুপচাপ বসে থাকার ভঙ্গিতে, কিংবা অকারণে দীর্ঘশ্বাসে।
হরিহর-এর জীবন এক ধরনের ঘুরপাক। সে স্বপ্ন দেখে—লেখালেখি, নতুন শুরু, অন্য কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে নামার আগেই আবার পিছিয়ে যায়।
ভোরে সে নতুন আশা নিয়ে বের হয়, সন্ধ্যায় ফেরে পুরোনো ব্যর্থতা হাতে। এই আশা করা, হেরে যাওয়া, আবার আশা করা—এই চক্রে সে ঘুরতে থাকে। কোনো বড় পতন নেই, কিন্তু স্থিরতাও নেই। শুধু চলা আছে, বারবার।
ইন্দির ঠাকরুন সংসারের বাড়তি মানুষ। তাকে রাখা যায়, আবার পুরোপুরি দরকারও পড়ে না। এই জানাটার ভেতরেও তার এক ধরনের জেদ আছে।
তবু সে ভোরবেলা উঠে পান সাজে, পুরোনো কাঁথা রোদে দেয়, ছেঁড়া মাদুরে বসে গল্প বলে। কখনো অন্যের বাড়ি থেকে সামান্য খাবার চেয়ে নেয়, আবার সেই হাতেই শিশুদের জন্য রূপকথা তৈরি করে। সে জানে সে প্রান্তে আছে, কিন্তু সেই প্রান্তেই নিজের মতো একটা ছোট জায়গা বানিয়ে নেয়। এই জায়গাটা কারও চোখে পড়ে না। তবু ভোর হলে সে আবার পান সাজতে বসে।
এই চরিত্রগুলোকে আলাদা করে দেখলে আলাদা ছবি পাওয়া যায়। কিন্তু পথের পাঁচালী-এর ভেতর কেউ একা দাঁড়িয়ে নেই। সবাই একে অপরের পাশে, কখনো ধাক্কা খেয়ে, কখনো ধরে থেকে, কখনো একেবারে চুপচাপ।
এই সম্পর্কগুলোর ভেতর কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নেই। লেখক সেটাকে শেষ করেন না। কারণ এই জীবনও শেষ হয় না—শুধু চলতে থাকে।
আর সেই চলা—গ্রামের পথের মতো, শেষ না-হওয়া পাঁচালীর মতো—পথের পাঁচালী-কে থামতে দেয় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।