নীরব মহামারী
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫
শেষ কবে আপনি রাতে শুয়ে শুধু ফোন স্ক্রল করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছেন?
আর সকালে উঠে মনে হয়েছে, ভেতরটা আরও খালি?
হাজার হাজার বন্ধু লিস্টে, কিন্তু কথা বলার মতো কেউ নেই—এই ফিলিংটা কি খুব চেনা লাগছে? আমার তো লাগে। আর আমি জানি, আপনারও লাগে। এটা আর শুধু আমাদের দু-চারজনের সমস্যা নয়। এটা এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় নীরব মহামারী—ডিজিটাল লোনলিনেস।
কোভিডের সময়টা মনে আছে?
ঘরে বন্দি, সবাই অনলাইন। জুম ক্লাস, ভার্চুয়াল আড্ডা, ফেসবুক লাইভ। তখন মনে হতো, আমরা কত কানেক্টেড! কিন্তু মহামারি গেল, অভ্যাস রয়ে গেল। এখন তো আরও বেশি। তরুণরা দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে, কিন্তু বাস্তবে কেউ কারও সাথে নেই।
গত মাসে আমার এক কাজিনের সাথে কথা হলো। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বলল, “ভাই, দিনে ৬-৭ ঘণ্টা ইনস্টা-টিকটকে থাকি। সবাইকে দেখি ট্রিপে, পার্টিতে, সুখে। আমার লাইফটা মনে হয় একদম ফিকে। ফোন রেখে দিলে তো আরও খারাপ লাগে।” ওর গলায় যে হতাশা, সেটা শুনে আমার নিজেরই গা শিরশির করলো।
সোশ্যাল মিডিয়া তো শুধু অ্যাপ নয়, এটা একটা ফাঁদ। অ্যালগরিদম জানে কী দেখালে আমরা বেশি সময় থাকব। রাগের পোস্ট, ঈর্ষার ছবি, পারফেক্ট লাইফের রিল—এগুলোই বেশি দেখায়। ফলে কী হয়?
আমরা নিজেদের সাথে তুলনা করি। মনে হয় সবাই এগিয়ে, শুধু আমি পিছিয়ে। এ থেকে জন্ম নেয় অ্যাঙ্গজাইটি, ডিপ্রেশন।
আর সম্পর্ক?
সেটা তো আরও খারাপ অবস্থায়। একই ঘরে বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই আলাদা ফোনে। ডিনার টেবিলে কথা নেই, নোটিফিকেশনের শব্দ আছে। আগে মন খারাপ হলে বন্ধুকে ফোন করতাম। এখন স্টোরি দিই। ভুল বোঝাবুঝি হলে আগে কথায় মিটত, এখন ব্লক করে শেষ।
তরুণরা তো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই বয়সে তো নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সময়। কিন্তু এখন আত্মসম্মান ঠিক হয় লাইক-কমেন্ট দিয়ে। একটা পোস্টে কম লাইক পড়লে মনে হয় নিজেকে কেউ পছন্দ করে না। ভাইরাল না হলে মনে হয় ব্যর্থ। এই চাপ জমতে জমতে একসময় প্যানিক অ্যাটাক, বার্নআউট হয়।
সমাধান কী?
প্রথমে তো মানতে হবে—এটা আমার-আপনার দুর্বলতা নয়, এটা সিস্টেমের ফাঁদ। প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের সময় আর আবেগ বিক্রি করে টাকা কামাচ্ছে।
ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে পারি। ফোনের থেকে মানুষকে বেশি সময় দেওয়া। স্ক্রিন টাইম কমিয়ে বাস্তব আড্ডা বাড়ানো। মন খারাপ হলে পোস্ট না দিয়ে কাউকে ফোন করা। তরুণদের বোঝানো যে তাদের দাম কোনো অ্যালগরিদম ঠিক করে না।
শেষ কথা, ডিজিটাল দুনিয়া আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু চুপচাপ অনেক কিছু কেড়েও নিচ্ছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো আমাদের মনের শান্তি আর কাছের মানুষগুলো। যদি এই লেখা পড়ে আপনার মনে কিছু হয়, চুপ করে থাকবেন না। কারও সাথে শেয়ার করুন, কথা বলুন। হয়তো আপনার একটা কথাই কারও নীরব যন্ত্রণা কমাতে পারে।
#ডিজিটাললোনলিনেস #যুবমানসিকস্বাস্থ্য #SocialMediaReality #MentalHealthCrisis #PostCovidGeneration #ScreenVsSoul #মানসিকস্বাস্থ্য #চিন্তারখোরাক
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।