প্রেমাগ্নি
(প্রেম, অনুভূতি ও মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক গদ্য |
২৩ অক্টোবর ২০২৬
বললাম, “হৃদয়ে এত উত্তাপ জমে কেন?”
সে একটু হেসে বলল, “প্রেমাগ্নি তো এমনই হয়।”
“কিন্তু আগুনে তো পুড়ে যাওয়ার কথা। মানুষ প্রেমে পড়লে এত আনন্দ পায় কীভাবে?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আনন্দ পায় বলেই হয়তো পোড়ার কথা ভুলে থাকে। আবার কখনো পোড়ার পরও আগুনটার কাছেই ফিরে যেতে চায়।”
আমি তার দিকে তাকালাম। কথাটা শুনে মনে হলো, সে যেন নিজের কোনো পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা বলছে। জিজ্ঞেস করলাম, “তোমারও কি এমন হয়েছে?”
সে হেসে ফেলল। তবে হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।
“হয়েছে কি না, সেটা এখন আর ঠিক করে বলতে পারি না। কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো একসময় খুব স্পষ্ট মনে হয়। পরে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, ভালোবাসার সঙ্গে নিজের কল্পনাও মিশে ছিল অনেকটা।”
বললাম, “কল্পনা?”
“হ্যাঁ। মানুষটাকে যতটা চিনি, তার চেয়ে বেশি হয়তো নিজের মনে তাকে নিয়ে একটা ছবি এঁকে ফেলি। তারপর সেই ছবির সঙ্গে বাস্তব মানুষটার মিল খুঁজতে থাকি। কোথাও অমিল পেলেই কষ্ট হয়। অথচ দোষটা সব সময় অন্য মানুষেরও নয়।”
কথাটা অস্বীকার করতে পারলাম না। কাউকে ভালো লাগলে তার সামান্য কথাও মনে দাগ কাটে। একটা ছোট্ট বার্তা পেলে অকারণে হাসি আসে, আর উত্তর না পেলে বারবার ফোনের পর্দায় চোখ চলে যায়। যে মানুষটাকে একসময় নিজের জীবনের বাইরের একজন বলে জানতাম, ধীরে ধীরে তার আচরণই মনের ভেতর আবহাওয়া বদলে দিতে শুরু করে।
বললাম, “তাহলে প্রেম মানুষকে এত অস্থির করে কেন?”
সে বলল, “হয়তো তখন নিজের অনুভূতিগুলো আর একা নিজের থাকে না। অন্য একজন কী বলল, কী বলল না, কেন একটু চুপ করে রইল—এসবের মধ্যেও আমরা অর্থ খুঁজতে শুরু করি। কখনো সেই অর্থ সত্যি হয়, কখনো নিজের মনই বানিয়ে নেয়।”
“তাহলে কি ভালোবাসার মধ্যে সব সময় একটা ভয় কাজ করে?”
সে মাথা চুলকে বলল, “সবার ক্ষেত্রে জানি না। তবে হারানোর ভয়টা আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। কাউকে হারানোর আগেই আমরা কখনো কখনো তাকে হারানোর কষ্ট পেতে শুরু করি। মানুষটা তখনো পাশে আছে, অথচ মনে মনে তার চলে যাওয়ার দৃশ্যও তৈরি করে রাখি।”
আমি বললাম, “তবু যদি সে চলে যায়?”
সে এবার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছিল একটানা। সেই শব্দের ফাঁকে আমাদের দুজনের নীরবতাও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল, “চলে গেলে কষ্ট হবে। হয়তো অনেক দিন হবে। কিন্তু কাউকে ধরে রাখার জন্য নিজের মনের সব দরজা তার হাতে তুলে দিতে হবে কেন? সে থাকতে চাইলে থাকবে, না চাইলে হয়তো যাবে। এই কথাটা মুখে বলা সহজ, মেনে নেওয়া কঠিন।”
আমি বললাম, “তুমি কি মেনে নিতে পেরেছ?”
সে একটু হেসে বলল, “সবকিছু কি আর পেরেছি? কিছু নাম শুনলে এখনো থেমে যাই। কিছু পুরোনো কথা মনে পড়লে ভাবি, সেদিন অন্যভাবে বললে কি কিছু বদলাত? তারপর আবার নিজের কাজ করতে বসি। জীবন তো সব প্রশ্নের উত্তর না পেয়েও চলতে থাকে।”
তার কথায় কোনো উপদেশ ছিল না। বরং মনে হলো, সেও নিজের ভেতর থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। শুধু কিছু ব্যথার সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছে।
বললাম, “তাহলে এই যে হৃদয়ের ভেতর এত উত্তাপ, এত অস্থিরতা—এর শেষ কোথায়?”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জানি না। হয়তো সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। যে অনুভূতি একসময় সারাদিন জুড়ে থাকত, একদিন সেটা ব্যস্ত দুপুরে হঠাৎ মনে পড়ে। যে অপেক্ষায় রাত কাটত, পরে তার কথা মনে পড়লেও ঘুম নষ্ট হয় না। তবে কিছু অনুভূতি পুরোপুরি চলে যায় কি না, তা আমি বলতে পারব না।”
আমি আর প্রশ্ন করলাম না।
কখনো কখনো মানুষের কাছে উত্তর চাইতে গিয়ে বোঝা যায়, তার কাছেও সব উত্তর নেই। তবু তার কথার ভেতর নিজের অচেনা অনুভূতির একটা ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। হয়তো সেই কারণেই প্রেমের গল্প বারবার বলা হয়। মানুষ নতুন কোনো উত্তর পায় বলে নয়, নিজের না-বলা কথাগুলো অন্য কারও মুখে শুনতে পায় বলে।
ঘরের ফ্যান তখনো ঘুরছিল। বাইরে থেকে কোনো শব্দ আসছিল না।
আমি মনে মনে প্রথম প্রশ্নটিই আবার করলাম—হৃদয়ে এত উত্তাপ জমে কেন?
এবার মনে হলো, সব আগুনের ব্যাখ্যা খুঁজতে নেই। কিছু আগুনের নাম জানা যায়, তার আঁচও টের পাওয়া যায়, অথচ কোথা থেকে তার শুরু, তা আর মনে থাকে না।
শুধু কোনো এক নির্জন মুহূর্তে পুরোনো একটা নাম মনে পড়ে যায়। বুকের ভেতর সামান্য কেঁপে ওঠে কিছু একটা।
হয়তো প্রেমাগ্নি এমনই।
নিভে গেছে ভেবে যাকে ভুলে থাকি, তার সামান্য স্মৃতিতেই বুঝতে পারি—কোথাও একটু তাপ এখনো রয়ে গেছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।