নিজের ঘর, তবু পরের
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
পরিবার, নারী ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব
২১ অক্টোবর ২০২৬
যে উঠোনে সে হামাগুড়ি দিয়েছে, যে জানালার পাশে বসে মাধ্যমিক পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করেছে, যে ঘরে বসে মায়ের কাছে বায়না ধরেছে—একদিন সেই বাড়ি থেকেই তাকে বিদায় নিতে হয়। বিয়ের আগে কতবার যে সে শুনেছে, “একদিন তো পরের বাড়িতে যেতে হবে।” কথাটা শুনতে সাধারণ, কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত শিক্ষা—জন্মের বাড়িতে থেকেও একদিন তাকে পরের মানুষ হয়ে যেতে হবে।
বিয়ের পর মেয়েরা নতুন সংসার গড়ে। নতুন মানুষ, নতুন সম্পর্ক, নতুন দায়িত্ব নিয়ে জীবন এগিয়ে যায়। কিন্তু পুরোনো বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা কি সত্যিই বদলে যায়? নাকি বদলে যায় শুধু পরিবারের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি?
দায়িত্ব আছে, অধিকার কোথায়?
বাবা অসুস্থ হলে মেয়েকে ফোন করে বলা হয়, “একবার এসে দেখে যা।” মায়ের শরীর খারাপ হলে মেয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করতে হয়। পরিবারের বিপদে তার উপস্থিতি দরকার হয়, তার ভালোবাসা দরকার হয়, তার শ্রমও দরকার হয়।
কিন্তু সে-ই নিজের কোনো সমস্যায় বাবার বাড়িতে কয়েক দিন থাকতে চাইলে কখনো শুনতে হয়, “তোমার তো এখন নিজের সংসার আছে।”
এই কথার ভেতরে কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! পরিবারের দায়িত্ব পালনের সময় সে আপন, অথচ নিজের প্রয়োজনে আশ্রয় চাইলে তার পরিচয় বদলে যায়।
সব মেয়ে সম্পত্তির ভাগ চায় না। কেউ হয়তো বাবার বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকার কথাও ভাবে না। তার চাওয়া শুধু এতটুকু—জীবন কঠিন হয়ে উঠলে অন্তত একটি দরজা যেন তার জন্য খোলা থাকে। ফিরে এসে যেন মনে না হয়, সে কারও সংসারে বাড়তি মানুষ হয়ে এসেছে।
নিজের জন্মপরিবারের কাছে আশ্রয় চাওয়া কোনো দয়া ভিক্ষা নয়। বিয়ে একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি করে; পুরোনো সম্পর্কের মূল্য মুছে দেয় না।
সংসার মানেই কি সহ্য করা?
বিয়ের পর একটি মেয়েকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন সবকিছু মেনে নেওয়ার দায় শুধু তার ওপর পড়ে।
শ্বশুরবাড়িতে কোনো কিছু ভালো না লাগলে সে কথা বলতে পারে না। স্বামীর কোনো আচরণে কষ্ট পেলে প্রতিবাদ করতে দ্বিধা হয়। কারণ ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হয়েছে, সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।
ধরা যাক, একদিন রান্নাঘরে কোনো বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হলো। শাশুড়ি বিরক্ত হয়ে বললেন, “আমাদের বাড়িতে এভাবে হয় না।” মন খারাপ করে মেয়েটি মাকে ফোন করল। ওপাশ থেকে মা বললেন, “একটু মানিয়ে নে মা, সংসারে এসব হয়।”
দুই বাড়ির দুই মানুষই হয়তো নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে কথা বললেন। কিন্তু মেয়েটির কষ্টটা শুনল কে?
একদিকে নতুন বাড়িতে তাকে নিজের মতো করে গ্রহণ করা হচ্ছে না, অন্যদিকে জন্মের বাড়ি থেকেও ফিরে আসার সাহস পাচ্ছে না। ধীরে ধীরে সে নিজের কথাগুলো নিজের মধ্যেই আটকে রাখতে শেখে।
নীরবতা সব সময় শান্তির প্রমাণ নয়। কখনো কখনো মানুষ প্রতিবাদ করা ছেড়ে দেয়, কারণ সে জানে, তার কথা শুনে পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
সংসার টিকিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সংসারে একজন মানুষ প্রতিদিন নিজের সম্মান হারালে, শুধু সম্পর্কের নাম বাঁচিয়ে রাখাকে সাফল্য বলা যায় না।
ঘর কি শুধু একটি ঠিকানা?
একটি বাড়িতে ফিরে আসার জন্য কখনো কখনো মানুষের কত ব্যাখ্যা দিতে হয়! কেন এসেছে, কত দিন থাকবে, কবে ফিরে যাবে—প্রশ্নগুলো এমনভাবে করা হয়, যেন সে নিজের বাড়িতে নয়, কারও অতিথি হয়ে এসেছে।
অথচ ঘর তো সেই জায়গা, যেখানে ক্লান্ত হয়ে ফিরলে প্রথমেই নিজের কষ্টের হিসাব দিতে হয় না। যেখানে মন খারাপের কারণ বলতে না পারলেও কেউ পাশে বসে থাকে। যেখানে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করতে হয় না।
একজন মেয়ের বিয়ে হয়েছে বলে বাবার বাড়িতে তার পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। সে এখনো সেই বাবা-মায়ের সন্তান, যাদের হাত ধরে তার পৃথিবী চেনা শুরু হয়েছিল। তার শৈশব, স্মৃতি, আবেগ—কোনোটাই বিয়ের দিন মুছে যায়নি।
পরিবারের কাছে তাই মেয়ের ফিরে আসাটা অস্বস্তির বিষয় হওয়া উচিত নয়। তার জীবনে কোনো সংকট এলে আগে তার কথা শোনা দরকার। কী করা উচিত, সেই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার আগে তাকে বুঝতে হবে। বিশেষ করে নির্যাতন বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার পরামর্শ নয়, নিরাপদ আশ্রয় ও বাস্তব সহায়তাও জরুরি।
একইভাবে শ্বশুরবাড়িতেও তাকে শুধু কারও স্ত্রী কিংবা বউ হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি স্বতন্ত্র একজন মানুষ। তাঁর পছন্দ, মতামত, স্বপ্ন ও আত্মসম্মান আছে। সম্পর্কের মধ্যে এসবের জায়গা না থাকলে বাড়ি বড় হতে পারে, কিন্তু মন সংকুচিত হয়ে যায়।
দরজার পাশে পড়ে থাকা ব্যাগ
একটি মেয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছে। তার সঙ্গে ছোট একটি ব্যাগ। হয়তো কয়েকটি পোশাক, কিছু ব্যক্তিগত জিনিস, আর এমন কিছু কষ্ট—যেগুলো কাউকে ঠিকমতো বোঝাতে পারছে না।
সে ঘরে ঢোকার পর কেউ যদি জিজ্ঞেস না করে, “কবে চলে যাবি?”, বরং বলে, “আগে হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নে”—তাহলে সমস্যাগুলো মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে না। কিন্তু সে অন্তত বুঝবে, তার ফিরে আসাটা কারও কাছে বোঝা নয়।
তার ব্যাগটা যেন অতিথির মতো দরজার পাশে পড়ে না থাকে। আলমারিতে তার জন্য একটা তাক যেন সব সময় খালি থাকে। ছোট এই দৃশ্যগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আপন করে নেওয়ার সত্যিকারের অর্থ।
মেয়ের জন্য আলাদা ঘর থাকতেই হবে, এমন নয়। কিন্তু পরিবারের মধ্যে তার জন্য মানসিক জায়গা থাকা জরুরি। সে যেন জানে, জীবনের পথ বদলে গেলেও জন্মের বাড়িতে তাকে নতুন করে নিজের পরিচয় দিতে হবে না।
বিয়ের পর ঠিকানা বদলাতে পারে। বদলাতে পারে সম্পর্কের ধরন, দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস। কিন্তু একটি মেয়ের শৈশবের বাড়ি তার স্মৃতি থেকে মুছে যায় না, আর সেই বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কও কোনো নির্দিষ্ট দিনে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়।
কোনো এক বিকেলে সে হয়তো মায়ের পাশে বসে চা খাবে, বাবার পুরোনো চেয়ারটায় একটু সময় কাটাবে। কেউ তাকে তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেবে না।
সেদিন হয়তো সে প্রথমবারের মতো নিশ্চিন্তে অনুভব করবে—জীবনে যত পরিবর্তনই আসুক, এই বাড়িতে তার জন্য এখনো একটুখানি জায়গা আছে।
আর সেই অনুভূতির ভাষা হয়তো খুব ছোট—
“আমি এসেছি। এ বাড়ি আমারও।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।