মনের ভেতরের অদৃশ্য দেয়াল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৬ অক্টোবর ২০২৬
একজন মানুষ হঠাৎ বলতে শুরু করল, “ওরা আমাকে অনুসরণ করছে।”
পরিবারের কেউ হয়তো বিরক্ত হয়ে বলল, “এসব তোমার মনের ভুল।”
কিন্তু মানুষটি জানে, সে যা বলছে তা তার কাছে মনের ভুল নয়। সে সত্যিই মনে করছে কেউ তাকে অনুসরণ করছে, তার ক্ষতি করতে চাইছে। বাইরে থেকে আমরা যে পৃথিবীটা দেখি, তার সঙ্গে তার দেখা পৃথিবীটা তখন এক থাকে না।
সিজোফ্রেনিয়াকে বোঝার প্রথম দরজা সম্ভবত এখানেই।
সিজোফ্রেনিয়া একটি গুরুতর মানসিক অসুস্থতা। এতে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ এবং বাস্তবতাকে বোঝার ক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মানুষটি অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তার চিন্তার ভেতরে কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে।
এই রোগকে নিয়ে আমাদের সমাজে আরেকটি বড় ভুল ধারণা আছে। সিজোফ্রেনিয়া মানেই একজন মানুষের একাধিক ব্যক্তিত্ব তৈরি হওয়া নয়। এটি আলাদা রোগ। এখানে মূল সমস্যা হলো মানুষটি বাস্তব ঘটনা আর নিজের মনের তৈরি ধারণার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারা।
কেউ হয়তো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, তার ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে। কেউ মনে করে, আশপাশের মানুষ তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। আবার কেউ এমন কণ্ঠ শুনতে পারে, যা অন্য কেউ শুনছে না। এগুলো তার কাছে কল্পনা নয়। তার কাছে এগুলো সত্যি ঘটনা।
তাই তাকে বারবার “এসব মিথ্যা”, “তুমি পাগল হয়ে গেছ” বললে সমস্যাটা কমে না। বরং সে আরও একা হয়ে যেতে পারে।
সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ সবার মধ্যে এক রকম হয় না। কারও কথা এলোমেলো হয়ে যায়। প্রশ্নের সঙ্গে মিল না রেখে উত্তর দিতে থাকে। কারও আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কেউ আবার ধীরে ধীরে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যায়, নিজের যত্ন নেওয়া কমিয়ে দেয়, কোনো কাজেই আগ্রহ পায় না।
সবচেয়ে কঠিন দিক হলো, বাইরের মানুষ অনেক সময় এই পরিবর্তনগুলোকে অলসতা বা ইচ্ছার অভাব বলে ধরে নেয়।
“কাজ করতে চায় না।”
“কারও সঙ্গে মেশে না।”
“নিজেকে পরিষ্কার রাখে না।”
“সারাদিন ঘরে বসে থাকে।”
অথচ এর পেছনে অসুস্থতার প্রভাব থাকতে পারে।
এর পেছনে একটাই কারণ নেই। পরিবারের ইতিহাস, মস্তিষ্কের ভেতরের রসায়ন, আর আমাদের চারপাশের চাপ, অনেক কিছু মিলে এই দেয়ালটা তৈরি হতে পারে। বংশগত ঝুঁকি থাকলেই যে কারও সিজোফ্রেনিয়া হবে, এমন নয়। আবার কোনো একদিনের মানসিক চাপকে এর একমাত্র কারণও বলা যায় না।
সাধারণত কৈশোরের শেষ ভাগ থেকে তরুণ বয়সের মধ্যে এর লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। কারও ক্ষেত্রে আগে, কারও ক্ষেত্রে পরে। শুরুটা অনেক সময় খুব ধীরে হয়। মানুষটি আগের মতো কথা বলছে না, পড়াশোনা বা কাজে মন বসছে না, ঘুমের সমস্যা হচ্ছে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমে যাচ্ছে। পরিবার তখনও হয়তো ভাবছে, “বয়সের কারণে এমন করছে।”
সমস্যা বোঝার পর সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিক চিকিৎসা নেওয়া। মনোরোগ চিকিৎসক মানুষের কথা, আচরণ, দীর্ঘদিনের পরিবর্তন এবং অন্যান্য শারীরিক বা মানসিক কারণ বিবেচনা করে রোগ নির্ণয় করেন। শুধু একটি লক্ষণ দেখে সিজোফ্রেনিয়া বলা যায় না।
চিকিৎসার প্রধান অংশ সাধারণত মনোরোগের ওষুধ। এর পাশাপাশি প্রয়োজন হতে পারে মানসিক সহায়তা, পরিবারকে রোগটি সম্পর্কে বোঝানো, দৈনন্দিন জীবন সামলানোর প্রশিক্ষণ এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে রেখে চিকিৎসারও প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে বৈদ্যুতিক খিঁচুনি চিকিৎসাও ব্যবহার করা হয়।
এখানে পরিবারের ভূমিকা খুব বড়।
ওষুধ খাওয়ানোই শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। রোগী কী অনুভব করছে, সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া, অযথা তর্ক না করা, অপমান না করা এবং চিকিৎসা নিয়মিত চালিয়ে যেতে সাহায্য করাও চিকিৎসার অংশ হয়ে ওঠে।
আরেকটি ভয় পরিবারকে প্রায়ই তাড়া করে, “এই রোগ হলে বিয়ে হবে না”, “চাকরি থাকবে না”, “জীবন শেষ।”
এই ভয়ও অনেক সময় রোগের চেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তা পেলে অনেক মানুষই দীর্ঘ সময় ধরে নিজের জীবন সামলাতে পারেন, কাজ করতে পারেন এবং সম্পর্কও বজায় রাখতে পারেন। অসুস্থতা একজন মানুষের পুরো পরিচয় হয়ে যায় না।
সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয়গুলোর একটি হলো সামাজিক অপমান। মানুষ যখন নিজের অসুস্থতার কথা বলতে ভয় পায়, চিকিৎসা নিতে লজ্জা পায়, তখন রোগটি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। মানসিক অসুস্থতাকে চরিত্রের দোষ বা দুর্বলতা হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হয় না।
সিজোফ্রেনিয়া একজন মানুষের চিন্তার জগৎ বদলে দিতে পারে। সে তখনও কারও সন্তান, কারও ভাই। তারও ভয় আছে, নিরাপদে বাঁচার ইচ্ছা আছে। শুধু তার পৃথিবীটা আমাদের মতো দেখায় না।
মনের ভেতরের দেয়ালটা অদৃশ্য বলেই আমরা সেটাকে দেখতে পাই না। কিন্তু যে মানুষটি সেই দেয়ালের ভেতরে আটকে যায়, তার কাছে সেটাই হয়ে উঠতে পারে পুরো পৃথিবী।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।