নৈকট্যের ভ্রম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। মার্চ ২৪, ২০২৬
“ফেসবুকে লেখা, ব্লগে কমেন্ট—দূরত্ব কি সত্যিই কমেছে, নাকি আমরা শুধু কাছাকাছি থাকার ভান করছি?”
রাতে একটা লেখা পড়ছিলাম।
না—পড়া ঠিক না। স্ক্রল করছিলাম।
তিনশোর বেশি লাইক। মন্তব্যে আগুন, হাততালি, দু-একটা দীর্ঘ প্রশংসা। লেখাটা শেষ করতে সময় লাগল দুই মিনিটেরও কম। শেষ করেই নিচে নেমে গেলাম।
পাঁচ সেকেন্ড পর হঠাৎ থামলাম।
আমি কি আদৌ কিছু পড়লাম?
এই প্রশ্নটা বিরক্তিকর। কারণ এর উত্তরটা খুব স্বস্তিদায়ক না।
আমরা এখন প্রায় ধরে নিই—লেখক আর পাঠকের দূরত্ব কমেছে। লেখক আর দূরের কেউ নন; তিনি টাইমলাইনে আছেন, নোটিফিকেশনে আছেন, ইনবক্সে ধরা যায়। লেখা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া আসে।
সবকিছু দ্রুত। দৃশ্যমান। পরিমাপযোগ্য।
দেখে মনে হয়—লেখা পৌঁছাচ্ছে।
কিন্তু পৌঁছানো আর পড়া—দুটো কি এক জিনিস?
একজন পরিচিত ফেসবুক লেখকের পোস্ট দেখেছিলাম—লম্বা লেখা, সামাজিক একটা জটিল প্রসঙ্গ নিয়ে। এক ঘণ্টার মধ্যে হাজারের কাছাকাছি রিঅ্যাকশন। মন্তব্যে “অসাধারণ”, “ভীষণ দরকারি লেখা”—এই ধরনের বাক্য ভরতি।
কিন্তু কেউ আসলে যুক্তিটা ধরেছে কি না, বোঝা কঠিন।
হয়তো ধরেছে।
হয়তো না।
এই “হয়তো”টাই এখন সমস্যা।
কারণ প্রতিক্রিয়া এখন অনেক সময় পাঠের প্রমাণ না—উপস্থিতির চিহ্ন। যেন আমরা বলছি, “আমি দেখেছি”—কিন্তু “আমি ভেবেছি”—তা বলছি না।
এটা কি পাঠকের বদল, নাকি প্ল্যাটফর্মের?
সম্ভবত দুটোই।
প্ল্যাটফর্ম আমাদের শিখিয়েছে দ্রুত সাড়া দিতে। থামা, ধীরে পড়া, ফিরে গিয়ে ভাবা—এসব একটু একটু করে সরে যাচ্ছে।
আর লেখক? তিনি একা থাকেন না। প্রতিটি লেখার নিচে তাৎক্ষণিক বিচার। কোন লাইনে লাইক বাড়ছে, কোথায় কম—এই অদৃশ্য মানচিত্র চোখে পড়ে।
তখন লেখা বদলায়।
চুপচাপ। ধীরে।
বাক্য ছোট হয়। আঘাত দ্রুত আসে। এমনভাবে বলা হয়, যাতে থামতে না হয়।
কারণ থামা মানে ঝুঁকি—পাঠক হয়তো স্ক্রল করে চলে যাবে।
সবাই কি এমন লিখছেন? না।
তবু একটা চাপ তৈরি হয়েছে—এটা অস্বীকার করা কঠিন।
আরেকটা বদল আরও সূক্ষ্ম।
আমরা এখন লেখককে পড়ি না শুধু—আমরা তাঁকে দেখি। তাঁর ছবি, তাঁর মত, তাঁর প্রতিদিনের উপস্থিতি। ফলে লেখাটা আলাদা করে দাঁড়ায় না সবসময়; লেখকের সঙ্গে মিশে যায়।
একই লেখা—একজন অচেনা মানুষ লিখলে হয়তো হারিয়ে যেত। পরিচিত কেউ লিখলে ছড়িয়ে পড়ে।
এটা কি লেখার শক্তি, নাকি পরিচিতির?
প্রশ্নটা অস্বস্তিকর বলেই হয়তো আমরা পাশ কাটাই।
সহজলভ্যতার কথাও আসে এখানে। এখন লেখকের কাছে পৌঁছানো কঠিন না। একটা কমেন্ট, একটা ইনবক্স—সংযোগ হয়ে যায়।
শুনতে ভালো লাগে।
কিন্তু যা খুব সহজে পাওয়া যায়, সেটা আমরা ধরে রাখি কম।
আগে লেখককে ঘিরে একটা দূরত্ব ছিল—যেটা হয়তো অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে, কিন্তু সেই দূরত্বই লেখাকে আলাদা করে দেখার জায়গা দিত। এখন লেখক সবসময় সামনে। ফলে তাঁর লেখা আর তাঁর উপস্থিতি—দুটো আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়।
এতে কী হারাচ্ছি?
হয়তো কিছু না।
হয়তো এমন কিছু, যা আমরা টেরই পাচ্ছি না।
ডিজিটাল মাধ্যম যে নতুন কণ্ঠকে জায়গা দিয়েছে—এটা সত্যি। অনেকেই লিখছেন, পড়া হচ্ছেন, আলোচনায় আসছেন।
তবু একটা প্রশ্ন থেকে যায়—
আমরা কি সত্যিই বেশি পড়ছি, নাকি শুধু বেশি দেখছি?
এখানে একটা অস্বস্তিকর স্বীকারোক্তি দরকার।
আমি নিজেও এখন কোনো লেখা পোস্ট করার পর লাইক দেখি।
কেউ কী বলল—সেটার আগে দেখি কতজন প্রতিক্রিয়া দিল।
কখনো কখনো মনে হয়—আমি কি লিখছি, নাকি প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করছি?
এই বদলটা কবে হলো, ঠিক মনে নেই।
হয়তো এইখানেই আসল ফাঁকটা তৈরি হয়েছে।
লেখা আর প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে।
দূরত্ব কমেছে—এটা ঠিক।
কিন্তু এই নৈকট্যের ভেতরেই একটা অদৃশ্য ফাঁক রয়ে গেছে।
আমরা আগের মতো দূরে নেই।
আবার আগের মতো কাছেও না।
হয়তো এই কারণেই—এখন কোনো লেখা শেষ করেও আমি থামি না।
#ডিজিটাল_যুগ #লেখক_পাঠক #লাইক_সংস্কৃতি #সাহিত্য_নাকি_কনটেন্ট #মননের_সংকট
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।