যে মানুষটা শব্দ দিয়ে বিদ্রোহ শিখিয়েছিল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৫ মে, ২০২৬
কিছু মানুষ সময়ের ভেতরে বাঁচে।
আর কিছু মানুষ সময়কে নাড়িয়ে দিয়ে যায়।
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন দ্বিতীয় দলের মানুষ।
তিনি শুধু কবি ছিলেন না।
তিনি ছিলেন একসাথে মসজিদের আজান আর লেটো দলের ঢোল।
এক হাতে বিদ্রোহ, অন্য হাতে ভালোবাসা।
এই কারণেই তাঁকে এক নামে মনে রাখা যায় না।
১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া “দুখু মিয়া” ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠিন মুখ দেখেছেন।
মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, মক্তবে পড়িয়েছেন, রুটির দোকানেও কাজ করেছেন।
আজকের ভাষায় বললে —দিনে বেঁচে থাকার লড়াই, রাতে স্বপ্ন দেখার সাহস।
কিন্তু এখানেই নজরুল আলাদা।
যে ছেলেটা সকালে আজান দিচ্ছে, সেই ছেলেই বিকেলে লেটো দলে গান লিখছে।
হিন্দু পুরাণ পড়ছে। নাটক করছে। কবিতা লিখছে।
নজরুলকে একটা নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়।
যে নদী পথে যত সংস্কৃতি পেয়েছে, সব নিজের ভেতরে টেনে নিয়েছে।
১৯১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
করাচি সেনানিবাসে বসেই তাঁর সাহিত্যচর্চা আরও গভীর হয়।
রবীন্দ্রনাথ পড়ছেন, হাফিজ পড়ছেন, গান লিখছেন, কবিতা লিখছেন।
তারপর পাঁচ বছর কেটে গেল।
১৯২২ সালে এল সেই বিস্ফোরণ — “বিদ্রোহী”।
“বল বীর —
আমি চির উন্নত শির!”
এই কবিতা শুধু সাহিত্য ছিল না।
এটা ছিল শিকল ভাঙার শব্দ।
ব্রিটিশ সরকারও বুঝেছিল ব্যাপারটা।
কারণ কখনো কখনো একটা কবিতা বন্দুকের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
ধর্ম নিয়েও নজরুল ছিলেন ব্যতিক্রম।
তিনি মুসলিম ছিলেন।
কিন্তু শুধু মুসলিমদের কবি ছিলেন না।
তিনি কালী নিয়ে শ্যামা সংগীত লিখেছেন।
আবার ইসলামী গজলেও নতুন সুর এনেছেন।
তিনি বলেছিলেন—
“আমি হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় এনে হাত মেলানোর চেষ্টা করেছি।”
আজকের পৃথিবীতে এই কথাটা আরও বড় হয়ে শোনায়।
কারণ আমরা এখনও বিভক্ত হতে শিখছি।
আর নজরুল তখনই মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে শেখাচ্ছিলেন।
নজরুলের জীবন শুধু বিদ্রোহে ভরা না।
ভালোবাসাও ছিল গভীর।
প্রমীলা দেবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সংগ্রামময়, কিন্তু আন্তরিক।
সংসার, অসুস্থতা, দারিদ্র্য — সব একসাথে এসেছে জীবনে।
১৯৪২ সালে আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি।
ধীরে ধীরে হারালেন বাকশক্তি।
তারপর স্মৃতি।
তারপর নীরবতা।
যে মানুষ শব্দ দিয়ে ঝড় তুলত,
শেষ জীবনে সেই মানুষটাই চুপ হয়ে গেলেন।
এ যেন মাঝপথে থেমে যাওয়া এক পিয়ানো।
চিকিৎসার জন্য তাঁকে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় নেওয়া হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা জানান, মস্তিষ্কের এক বিরল রোগ তাঁর শব্দের ঘরটাই ধীরে ধীরে তালাবন্ধ করে দিচ্ছে।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষ উদ্যোগে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।
১৯৭৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সমাধিস্থ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।
কারণ তিনি নিজেই লিখেছিলেন—
“মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই...”
আজও তাঁর কবিতা মিছিলে উচ্চারিত হয়।
তাঁর গান রেডিওতে বাজে।
তাঁর লেখা প্রেমিকও পড়ে, প্রতিবাদকারীও পড়ে।
এই কারণেই নজরুল শুধু একজন কবি নন।
তিনি এক ধরনের শক্তি।
একটা অস্থির, সাহসী, মানবিক শক্তি — যে শক্তির নাম নজরুল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।