নিজের জীবনটাও খরচ করেছি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৫ নভেম্বর ২০২৬
একদিন পুরোনো একটা ডায়েরি খুলে বসেছিলাম। পাতাগুলো উল্টাতে গিয়ে কয়েকটি নাম চোখে পড়ল। পাশে তারিখ, কোথাও টাকার হিসাব, কোথাও ছোট করে লেখা কোনো ঘটনার কথা। অনেক দিনের পুরোনো হিসাব। অথচ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, ঘটনাগুলো যেন গতকালই ঘটেছে।
একটা পাতায় লেখা ছিল:
১২ মার্চ, রাকিবকে ৫,০০০ টাকা।
১৫ মার্চ, মায়ের জন্মদিনে শাড়ি।
২০ মার্চ, বন্ধুর বিপদে সাহায্য।
২৮ মার্চ, একজনের জন্য নিজের কাজ ফেলে বাইরে যাওয়া।
পাতার নিচে আরও কিছু হিসাব ছিল। কার কখন কী দরকার হয়েছে, কোথায় কত সময় দিয়েছি, কার মন খারাপ হলে কত রাত কথা বলেছি, সবকিছুরই কোনো না কোনো চিহ্ন ছিল।
শুধু একটা হিসাব কোথাও লেখা ছিল না।
নিজের জন্য কী করেছি?
প্রশ্নটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। মনে পড়ছিল, কতবার নিজের পছন্দের জিনিসটা কেনা হয়নি। কতবার নিজের কাজ ফেলে অন্যের কাজে ছুটে গেছি। কত রাত ঘুমাতে পারিনি, শুধু কারও মন খারাপ বলে। কতবার নিজের কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেছি, কারণ সামনের মানুষটা কষ্ট পাবে।
একটা ফোনকলের কথা মনে পড়ল। সেদিন আমারও কথা বলার দরকার ছিল। ভেতরে জমে থাকা কিছু কথা কাউকে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওপাশের মানুষটা সমস্যায় ছিল। আমি নিজের কথাটা না বলে তার কথা শুনেছিলাম। ফোন রাখার পর আর কাউকে কিছু বলিনি।
এমন ঘটনা একবার নয়, বহুবার হয়েছে।
কেউ বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়িয়েছি। কেউ টাকা চাইলে নিজের প্রয়োজন পিছিয়ে দিয়েছি। কেউ একটু সময় চাইলে নিজের ব্যস্ততা সরিয়ে রেখেছি। কখনো মনে হয়েছে, আজ নিজের জন্য কিছু করব। তারপর একটা ফোন এসেছে, একটা অনুরোধ এসেছে, আর দিনটা অন্য কারও হয়ে গেছে।
এসবের জন্য কাউকে দোষ দিতে পারি না। তারা চেয়েছে, আমি দিয়েছি। সাহায্য করার সময় আমারও ভালো লেগেছে। কারও মুখে স্বস্তি দেখেছি, কারও বিপদ একটু কমাতে পেরেছি, কারও একাকিত্বের রাতে সঙ্গ দিয়েছি। এসবের মূল্য আমার কাছে কম নয়।
আমরা অনেক সময় নিজের কাজটা পরে করব বলে রেখে দিই। নিজের ইচ্ছাকে ছোট করি, নিজের কষ্টকে তুচ্ছ করি। ভাবি, একটু পরে নিজের জন্য সময় বের করব। একটু পরে নিজের কথাটাও বলব।
সেই একটু পরে কখনো কখনো আর আসে না।
ডায়েরির মাঝখানে একটা পাতা ছিল, যেখানে কোনো হিসাব লেখা নেই। পাতাটা একেবারে ফাঁকা। সেখানে কলম ধরেছিলাম। নিজের জন্য কিছু লিখতে গেলে যে এতটা অসুবিধা হবে, আগে বুঝিনি।
কী চাই, কী ভালো লাগে, কী করতে ইচ্ছা করে, সব প্রশ্ন যেন একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। অথচ অন্যের জন্য কী করতে হবে, সেটা ঠিক করতে কখনো এত সময় লাগেনি।
শেষ পর্যন্ত পাতার এক কোণে লিখলাম, নিজের জন্য।
কী লিখব, কতটা লিখব, কিছুই ঠিক করতে পারিনি। শুধু ওই দুটো শব্দ রেখে ডায়েরিটা বন্ধ করেছিলাম।
ডায়েরিটা বন্ধ করেছিলাম। পুরোনো হিসাবগুলো মুছে ফেলিনি। নতুন পাতায় শুধু লিখেছিলাম, নিজের জন্য।
পাতাটা এখনো ফাঁকাই আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।