বাংলা সাহিত্যে কৌলীন্যের অভিশাপ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। এপ্রিল ০১, ২০২৬
একজন পুরুষের একাধিক বিয়ে — সমাজ তখন বলত ‘কুলীন’, আজ বলে ‘ট্র্যাডিশনাল টক্সিক’। বাংলা সাহিত্য কী বলে?
একটা সময় ছিল, যখন একজন পুরুষের একাধিক বিয়ে করাকে সমাজ সম্মানের চোখে দেখত। ‘কুলীন’ বলে গর্ব করা হতো। কিন্তু বাংলা সাহিত্য সেই গর্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ানক যন্ত্রণার ছবি তুলে ধরেছে। রামনারায়ণ তর্কালঙ্কার থেকে শুরু করে উনিশ শতাব্দীর অনেক নাটককার এই প্রথার ভয়াবহতা দেখিয়েছেন।
রামনারায়ণ তর্কালঙ্কারের কুলীনকুলসর্বস্ব নাটকটি এই বিষয়ে সবচেয়ে তীব্র আঘাত। এখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে কুলীন প্রথার জন্য একজন পুরুষ একাধিক বিয়ে করে, আর প্রত্যেক স্ত্রীকে জীবন্ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। নারীরা ঘরের ভেতর বন্দি হয়ে থাকে, স্বামীর ছায়া পর্যন্ত দেখতে পায় না। কেউ কেউ বিধবা হয়ে যায়, কেউ আবার স্বামীর অবহেলায় ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। নাটকে দেখানো হয়েছে যে কুলীন পুরুষেরা শুধু বিয়ে করার জন্য বিয়ে করত, সংসার করার জন্য নয়। ফলে পরিবারগুলো ভেঙে যেত, নারীরা অসহায় হয়ে পড়ত।
তাঁর আরেকটি নাটক নবনাটক-এও একই চিত্র। এখানে কুলীন প্রথার কারণে নারীদের জীবন কীভাবে নষ্ট হয়, সেটা আরও স্পষ্ট করে দেখানো হয়েছে। একজন কুলীন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকত, কিন্তু তিনি কারো সঙ্গে সত্যিকারের সংসার করতেন না। ফলে স্ত্রীরা একা, অবহেলিত এবং সমাজের চোখে ‘পতিতা’র মতো হয়ে যেত। এই প্রথা শুধু একজন নারীর জীবন নয়, পুরো পরিবারের সুখ-শান্তি ধ্বংস করে দিত।
আমাদের পাড়ায় অনিমা ঠাকুরমা ছিলেন। তাঁর স্বামীর নাম মনে নেই — সবাই বলত ‘বড়বাবু’। তিনটি বিয়ে, কিন্তু কোনো সংসারে থাকতেন না। অনিমা ঠাকুরমার ঘরে একটা ছোট আয়না ছিল। তিনি সকালে চুল বাঁধতেন, বিকেলে খুলে দিতেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন। বলেছিলেন, “স্বামীর জন্য বাঁধি, স্বামী নেই, খুলে রাখি।” তাঁর চুল পাকা হয়ে গিয়েছিল, আয়নায় মুখ দেখতেন না। তাঁর চোখে যে শূন্যতা দেখেছি, সেটা আজও ভুলতে পারি না।
আজকের সমাজে কৌলীন্য প্রথা আইনত নেই, কিন্তু তার ছায়া এখনও রয়ে গেছে। অনেক জায়গায় এখনও ‘ভালো ঘর’ বলে একাধিক বিয়ে বা সম্পর্ক চলে। গ্রামে তো এখনও কিছু কিছু পরিবারে এই প্রথার আংশিক রূপ দেখা যায়। শহরে এটা আরও লুকিয়ে থাকে — ডিভোর্স, দ্বিতীয় বিবাহ বা গোপন সম্পর্কের আড়ালে। ফলে নারীরা আজও মানসিকভাবে একা হয়ে যান, পরিবার ভেঙে যায়।
সাহিত্য আমাদের শেখায় যে কোনো প্রথা যদি মানুষের মর্যাদা ও সুখ কেড়ে নেয়, তাহলে সেটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। কুলীন প্রথা ছিল ঠিক তেমনই এক অভিশাপ। এটা শুধু নারীদের জীবন নয়, পুরো পরিবারের সুখ-শান্তি ধ্বংস করে দিত। আজ আমরা যদি মনে করি এই প্রথা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, তাহলে আমরা নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করছি।
শহরের ফ্ল্যাটে আজও অনেক নারী আয়নায় মুখ দেখেন না। কিন্তু কারণটা বদলেছে — এখন সেলফিতে মুখ দেখানো হয়, কিন্তু স্বামীর চোখে নয়। কৌলীন্য প্রথা মরেনি, মুখ বদলেছে।
তোমার কাছে কৌলীন্যের অভিশাপ মানে কী? একটা সাদা শাড়ি, না একটা থামা আয়না?
#কৌলীন্য #বাংলাসাহিত্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।