যে রাতে বাবা কাঁদেনি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প ⋄ ২৪ নভেম্বর ২০২৫
আমাদের বাড়িটা মিরপুর ১২-এর একটা গলির ভেতর। টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে এমন শব্দ হয়, যেন কেউ পুরো রাত ধরে দরজায় ধাক্কা মারছে। বাবা বলতেন, “এই শব্দটা শুনলে ঘুম ভেঙে যায়, কিন্তু মনটা জেগে থাকে।”
গত পরশু রাতে আমি কলেজ থেকে ফিরে দেখি বাবা দাওয়ায় বসে। পায়ের কাছে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। ভেতরে দুটো পুরনো শার্ট আর একটা ছেঁড়া প্যান্ট। বাবা বললেন,
“আজ অফিস থেকে ছেড়ে দিয়েছে। বলল, বয়স হয়েছে। আর পারব না।”
বাবার বয়স মাত্র ৫৫ বছর। কিন্তু চোখের নিচে কালি এত গাঢ় যে মনে হয় ৮০ পেরিয়েছে।তার পর আবার প্রচন্ড অসুস্থ। হার্টের জটিল রোগে আক্রান্ত।
আমি পড়ি বিবিএ চতুর্থ সেমিস্টারে। পরীক্ষা আর কদিন পরে। ফি বাকি বারো হাজার সাতশো টাকা। বাসায় আছে দুই হাজার দুশো। বাকিটা কোথায় পাব জানি না।
কাল সকালে বাবা বেরিয়ে গেলেন। বললেন, “দুপুরের মধ্যে আসব।”
এলেন রাত সাড়ে দশটায়। হাতে একটা ছোট্ট পলিথিন। ভেতরে ছয় হাজার আটশো টাকা। সব কুড়ি-পঞ্চাশের নোট। কয়েকটা দশ টাকারও আছে। একদম ঘামে ভিজে গেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“বাবা, এত টাকা কোথায় পেলে?”
বাবা চুপ করে রইলেন। তারপর ধরা গলায় বললেন,
আমার পরিচিত অনেকের কাছে কাল ম্যাসেজ দিয়ে ছিলাম,সবাই দেখেছে কিন্তু কেউ জবাব দেয় নি।
“আজ সারাদিন ধানমন্ডি থেকে মতিঝিল, মতিঝিল থেকে গুলশান… যাদের চিনি, যাদের চিনি না, সবার কাছে গিয়েছিলাম। কেউ দিয়েছে পঞ্চাশ, কেউ একশো। একজন বলল, ‘আঙ্কল, আমার কাছে আছে দুশো। নিয়ে যান।’ আমি নিইনি। বলেছি, ‘তোমার ছেলে পড়ে। রাখো।’”
বাবা থামলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন,
“একজন বলল, ‘আপনি তো এককালে আমার বাবার বস ছিলেন।’ তারপর পকেট থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে দিল। আমি নিতে চাইনি। সে জোর করে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনি আমার বাবাকে একদিন চাকরি দিয়েছিলেন। আজ আমি আপনার মেয়েকে পড়ার সুযোগ দিচ্ছি।’”
বাবা আর বলতে পারলেন না। আমি দেখলাম, বাবার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে না। কিন্তু গাল বেয়ে যেন একটা নদী বইছে। আমি প্রথমবার বুঝলাম—পুরুষ মানুষ কাঁদে না বলে কথা নেই।
কাঁদে, শুধু চোখের বদলে বুক দিয়ে।
আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম,
“বাবা, আর কক্ষনো কারো কাছে যাবে না। আমি পড়া ছেড়ে দেব। চাকরি করব।”
বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“না।
তুই পড়বি। আমি আরেকটু হাঁটব। আর মাত্র কয়েকটা মাস। তারপর তুই যখন চাকরি করবি, আমি বাড়িতে বসে তোর জন্য চা বানাব।”
আজ সকালে আমি কলেজে গিয়ে ফি জমা দিয়ে এসেছি। রসিদটা হাতে নিয়ে বাবার কাছে গেলাম। বাবা দাওয়ায় বসে ছিলেন। রসিদ দেখে কিছু বললেন না। শুধু আমার হাতটা ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
আমি বাবার হাতে সেই ছয় হাজার আটশো টাকা ফেরত দিতে গেলাম। বাবা নিলেন না। বললেন,
“রাখ। এটা তোর প্রথম বেতনের টাকা। আমি আর নেব না।”
তোমরা যারা এখনো বাবা-মায়ের হাতে টাকা গুঁজে দাওনি, যারা এখনো বাবাকে বলোনি
“তুমি আর হাঁটবে না, আমি আছি”,
একদিন বাবা আর হাঁটতে পারবে না।
সেদিন যেন তোমার হাতে টাকা থাকে।
যেন তুমি বলতে পারো—
“বাবা, এবার তুমি বসো। আমি দাঁড়াব।”
আমি আজ থেকে দাঁড়িয়েছি। তোমরাও দাঁড়াও।যতদিন বাবা বেঁচে আছেন।
শেয়ার করো। যদি তোমার বাবা এখনো বেঁচে থাকেন আজই তাকে জড়িয়ে ধরো।
বলো, “বাবা, এবার আমি আছি।”
#যে_রাতে_বাবা_কাঁদেনি
#বাবার_হাতে_ঘাম_ভেজা_টাকা
#আমি_দাঁড়িয়েছি
#তুমিও_দাঁড়াও
#বাবা_আর_হাঁটবে_না
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।