অল্পের সুখ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ২৩ আগস্ট ২০২৬
অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাসটা হয়তো আমাদের ভেতর থেকেই হারিয়ে গেছে।
ছোটবেলায় ঈদের আগে নতুন জামা পাওয়ার আনন্দটা এখনো মনে আছে। জামাটা খুব দামি ছিল না। তবু হাতে পাওয়ার পর কয়েকবার খুলে দেখতাম। নতুন কাপড়ের ভাঁজের গন্ধ ছিল। মনে হতো, এই জামাটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জামা।
তখন আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছু দরকার হতো না।
এক কাপ চা, পছন্দের রান্না, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা, মাসের শেষে হাতে সামান্য টাকা—এসবের মধ্যেও মন ভরে যেত। জীবন খুব স্বচ্ছল ছিল না, কিন্তু যা ছিল তার দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসটা ছিল।
এখন আমাদের হাতে অনেক কিছু।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, তৃপ্তিটা যেন কমেছে।
আগের ফোনটা দিয়ে দিব্যি কাজ চলছিল। নতুন একটা মডেল বাজারে এল। হঠাৎ মনে হলো, নিজের ফোনটা পুরোনো হয়ে গেছে। পাশের মানুষ নতুন গাড়ি কিনল—নিজের গাড়িটা ছোট মনে হলো। কেউ বিদেশে ঘুরে ছবি দিল—নিজের জীবনে বহুদিন ধরে না হওয়া একটা ভ্রমণকে তখন বড় অভাব বলে মনে হলো।
অন্যের জীবন আমাদের চাহিদার মাপজোক বদলে দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ব্যাপারটাকে আরও সহজ করে দিয়েছে। সেখানে আমরা মানুষের পুরো জীবন দেখি না। দেখি সুন্দর কয়েকটি মুহূর্ত। নতুন গাড়ি, নতুন বাড়ি, সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি, দামি খাবারের টেবিল, হাসিমুখ।
আমরা সেই ছবিগুলো দেখি নিজের জীবনের এমন সময়ের সঙ্গে, যখন ঘর অগোছালো, পকেট ফাঁকা, শরীর ক্লান্ত।
তুলনাটা শুরু হওয়ার পর সমস্যাটা আর বাইরের থাকে না। ধীরে ধীরে নিজের জীবনটাই ছোট মনে হতে থাকে।
একদিনের কথা ভাবুন।
একজন মানুষ সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরল। দরজা খুলতেই সন্তান ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। স্ত্রী টেবিলে এক কাপ চা রেখে বললেন, “চা খেয়ে নাও।”
ঘরে বিলাসিতা নেই। হয়তো সোফাটাও পুরোনো। দেয়ালে নতুন কোনো সাজসজ্জা নেই। তবু মানুষটি বসে চা খাচ্ছে, সন্তান পাশে বসে দিনের গল্প করছে।
সেই মুহূর্তে তার জীবন হয়তো যথেষ্টই ছিল।
তারপর সে মোবাইলটা হাতে নিল।
একজন বিদেশে গেছে। আরেকজন নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে। কেউ নতুন গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি দিয়েছে। কারও সন্তান বিদেশে পড়তে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের ঘরটা ছোট লাগতে শুরু করল।
চায়ের স্বাদটাও হয়তো আগের মতো থাকল না।
অথচ বদলেছে কী?
ঘর বদলায়নি। চা বদলায়নি। সন্তান বদলায়নি। বদলেছে শুধু তার চোখের সামনে রাখা মাপকাঠি।
আমরা যা পেয়েছি, তার হিসাব খুব কম করি। যা পাইনি, তার হিসাব করি অনেক বেশি।
এই অভ্যাস শুধু মন খারাপ করে না, পকেটেও চাপ ফেলে। অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবন সাজাতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় এমন কিছু কিনে ফেলে, যার প্রয়োজন ছিল না। তারপর সেই কেনাকাটার টাকা জোগাড় করতে আরও কাজ, আরও চাপ, কখনো ঋণ।
একটা নতুন জিনিস কিছুদিন আনন্দ দেয়।
তারপর সেটাই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
নতুন ফোন পুরোনো লাগে। নতুন গাড়ি সাধারণ লাগে। বড় বাসা কিছুদিন পর আর বড় মনে হয় না।
তারপর আবার কিছু একটা দরকার হয়।
এই চক্রের শেষ কোথায়?
সমস্যা আরও কিছু পাওয়ার ইচ্ছায় নয়। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সামনে এগোতে চায়। সমস্যা তখন, যখন আরও পাওয়ার ইচ্ছাটা এখন যা আছে তার আনন্দটুকু খেয়ে ফেলে।
আমাদের আগের প্রজন্মের জীবনেও অভাব ছিল। অনেক কিছু কেনার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু একটা জিনিস তারা জানত—কম জিনিস দিয়েও দিন ভালো কাটানো যায়।
একসঙ্গে বসে খাওয়া, সন্ধ্যার পর গল্প করা, পুরোনো জামা যত্ন করে রাখা, ছুটির দিনে কোথাও না গিয়ে বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা—এসবের জন্য আলাদা বাজেট লাগত না।
আমরা হয়তো এখন অনেক বেশি কিনতে পারি।
কিন্তু সবকিছুর আনন্দ ধরে রাখতে পারি কি?
হয়তো এই জায়গাটাতেই একটু থামা দরকার।
কিছু কেনার আগে নয় শুধু; কিছু চাওয়ার আগেও।
আমি কি সত্যিই এটা চাই, নাকি অন্য কারও জীবন দেখে চাইছি?
আমার যে জীবনটা এখন আছে, সেটাকে কি আমি নিজের চোখে দেখছি, নাকি অন্যের চোখ দিয়ে?
প্রশ্নগুলো খুব বড় নয়। কিন্তু উত্তরগুলো অস্বস্তিকর হতে পারে।
কারণ কখনো কখনো আমরা যে জিনিসটার অভাব বোধ করছি বলে মনে করি, সেটার অভাব আসলে নেই। অভাবটা তৈরি হয়েছে তুলনায়।
একটা পুরোনো ফোন হাতে নিয়েও মানুষ সুখী হতে পারে। ছোট বাসাতেও সন্ধ্যা সুন্দর হতে পারে। একই চায়ের কাপ প্রতিদিনও ভালো লাগতে পারে। শুধু তার দিকে তাকানোর চোখটা বদলাতে হয়।
হয়তো অল্পতে সন্তুষ্ট থাকা মানে অল্প চাওয়া নয়।
বরং যা আছে, সেটাকে অল্প মনে না করা।
জীবন থেকে সব বড় স্বপ্ন বাদ দিতে হবে না। আরও ভালো থাকার চেষ্টা থাকবে। আয় বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে। নতুন কিছু পাওয়ার ইচ্ছাও থাকবে।
শুধু এতটুকু যেন থাকে—নতুন কিছু পাওয়ার অপেক্ষায় পুরোনো সুখগুলোকে যেন আমরা অবহেলা না করি।
সেই এক কাপ চা।
সন্তানের হঠাৎ এসে জড়িয়ে ধরা।
বাড়ি ফেরার সময় পরিচিত গলিটা।
বৃষ্টির দিনে বারান্দায় বসে থাকা।
এসবের দাম বাজারে লেখা থাকে না।
তবু কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে দামী জিনিসগুলোই কেনাবেচার বাইরে থাকে।
তাহলে প্রশ্নটা হয়তো এই নয়—আমার আর কী নেই?
প্রশ্নটা কি বরং এমন হতে পারে,
আমার যা আছে, তার দিকে শেষ কবে মন দিয়ে তাকিয়েছিলাম?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।