ফোনটা আর এলো না
(সম্পর্ক, কৃতজ্ঞতা ও মানবমন)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২১ অক্টোবর ২০২৬
বিকেল থেকে বারান্দায় বসে আছেন রহিম সাহেব। সামনের বাড়ির ছাদে কয়েকটা চড়ুই পাখি লাফালাফি করছে। টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। হাতে মোবাইল ফোন। ছেলের চাকরির ব্যাপারে একটা ফোন করতে হবে তাঁকে।
নম্বরটা পরিচিত। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এই ছেলেটাই একদিন তাঁর সামনে বসে কাঁদছিল।
চাকরি নেই, বাড়িভাড়া বাকি, পরিবারের কাছে টাকা চাওয়ার মুখ নেই। কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেটা বারবার চোখ মুছছিল। রহিম সাহেব সেদিন তাকে শুধু টাকা দেননি, পরিচিত একজনের সঙ্গে কথা বলে কাজের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। ছেলেটা বিদায় নেওয়ার সময় হাত ধরে বলেছিল, ‘স্যার, আপনার কথা কোনো দিন ভুলব না।’
সেই কথাটা রহিম সাহেবের মনে আছে।
এখন ছেলেটার ভালো চাকরি হয়েছে। সংসার হয়েছে। শুনেছেন, বেশ ভালোই আছে। তাই নিজের ছেলের জন্য একটু সহযোগিতা চাইতে তাঁর সংকোচ হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ভাবলেন, বিপদে তো একদিন ছেলেটার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আজ একটা কথা বললে নিশ্চয়ই খারাপ ভাববে না।
তিনি ফোন করলেন।
ওপাশ থেকে ছেলেটা ধরল। বলল, ‘স্যার, একটা মিটিংয়ে আছি। একটু পরে আপনাকে ফোন করছি।’
রহিম সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি কাজ শেষ করে ফোন দিয়ো।’
ফোন রেখে তিনি আবার বারান্দায় বসলেন।
সেদিন আর ফোন আসেনি।
পরদিন সকালে ভাবলেন, হয়তো ব্যস্ত ছিল। দুপুরে আবার নম্বরটা খুললেন, কিন্তু ফোন করলেন না। মানুষকে নিজের প্রয়োজনের কথা বারবার বলতে তাঁর ভালো লাগে না। বিকেলে ছেলের কাছে শুনলেন, ছেলেটার সঙ্গে নাকি বাজারে দেখা হয়েছে এক পরিচিতের। বেশ হাসিমুখেই কথা বলেছে, কারও সঙ্গে ফোনে কথাও বলছিল।
রহিম সাহেব আর কিছু বললেন না।
কয়েক দিন পর একটি অনুষ্ঠানে তাদের দেখা হলো। ছেলেটা দূর থেকে রহিম সাহেবকে দেখে এগিয়ে এল। সালাম দিল, কুশল জিজ্ঞেস করল। মুখে হাসি, কথাবার্তায় ভদ্রতা। রহিম সাহেবও স্বাভাবিকভাবে কথা বললেন। চাকরির কথা জানতে চাইলেন, পরিবারের খবর নিলেন। ছেলেটা বলল, সব ভালো।
সুযোগ বুঝে রহিম সাহেব নিজের ছেলের কথা তুলতে গিয়েও থেমে গেলেন। ছেলেটা ততক্ষণে অন্য একজনকে দেখে বলেছে, ‘স্যার, একটু আসছি।’ তারপর ভিড়ের মধ্যে চলে গেল।
রহিম সাহেব দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর হাতে তখনো চায়ের কাপ। কাপের চা শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই।
বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে ঘটনাটা বলেননি। ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা, ওনার সঙ্গে কথা হয়েছে?’
তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, দেখা হয়েছিল।’
ছেলেটার চাকরির ব্যবস্থা সেদিনও হলো না। অন্য জায়গায় চেষ্টা চলতে থাকল। সংসারের স্বাভাবিক কাজকর্মও থেমে থাকল না। শুধু রহিম সাহেবের মনে একটা পুরোনো কথা মাঝেমধ্যে ফিরে আসত—‘আপনার কথা কোনো দিন ভুলব না।’
কথাটা যে মিথ্যা ছিল, তা হয়তো পুরোপুরি বলা যায় না। যে সময় ছেলেটা বিপদে ছিল, সে হয়তো সত্যিই কৃতজ্ঞ ছিল। কিন্তু সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই কৃতজ্ঞতার জায়গায় অন্য কিছু এসে বসেছে। নতুন পরিচয়, নতুন ব্যস্ততা, নিজের অবস্থান নিয়ে নতুন হিসাব। যে মানুষটির সাহায্যে সে একদিন একটু সামনে এগিয়েছিল, সেই মানুষটির কাছে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন আর সে অনুভব করেনি।
রহিম সাহেবও তো প্রতিদানের খাতা খুলে বসেননি। ছেলেটার কাছ থেকে টাকা ফেরত চাননি, পুরোনো উপকারের কথা মনে করিয়ে দেননি। শুধু ভেবেছিলেন, প্রয়োজনের সময় একটা কথা বলবেন। ছেলেটা সাহায্য করতে না পারলেও সমস্যা ছিল না। সরাসরি বললেই পারত, ‘স্যার, এই মুহূর্তে আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।’
রহিম সাহেব হয়তো মন খারাপ করতেন, কিন্তু বুঝতেন।
অপমানটা সেখানে নয় যে ছেলেটা তাঁর ছেলের চাকরি করে দিতে পারেনি। অপমানটা হলো, সে কথাটা বলার প্রয়োজনও অনুভব করেনি। একসময় যে মানুষটির সামনে নিজের অসহায়ত্ব লুকাতে পারেনি, আজ সেই মানুষটির সামনেই নিজের সুবিধামতো ব্যস্ত হয়ে গেল।
আমাদের সম্পর্কগুলোতে এমন পরিবর্তন খুব নিঃশব্দে ঘটে। কেউ একদিনে পর হয়ে যায় না। প্রথমে ফোনের উত্তর দিতে দেরি হয়, তারপর কথা ছোট হয়ে আসে, দেখা হলে তাড়াহুড়ো থাকে। একসময় পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি থাকে, কিন্তু সেই সম্পর্কের প্রতি দায়বোধ আর থাকে না।
যিনি সাহায্য করেছিলেন, তিনি হয়তো ঘটনাটা বহু বছর মনে রাখেন। আর যিনি সাহায্য পেয়েছিলেন, তাঁর কাছে সেটা জীবনের অনেক ঘটনার মধ্যে একটি হয়ে যায়। দুজনের স্মৃতিতে একই ঘটনার ওজন সমান থাকে না।
এ কারণেই কৃতজ্ঞতা চাইলেই পাওয়া যায় না। কাউকে বিপদ থেকে তুলে আনা যায়, কিন্তু তার মনে আপনার জন্য কতটুকু জায়গা থাকবে, সেটা ঠিক করে দেওয়া যায় না। এই সত্যটা মেনে নেওয়া সহজ নয়, বিশেষ করে যখন নিজের ভালোবাসা বা আন্তরিকতাকে কেউ এমনভাবে পাশ কাটিয়ে যায়, যেন তার কোনো মূল্যই ছিল না।
রহিম সাহেব পরে আর ছেলেটিকে ফোন করেননি। কোনো অভিযোগও করেননি। পরিচিতদের কাছে তার বদনাম করেননি, পুরোনো সাহায্যের গল্প শুনিয়ে তাকে ছোট করেননি। ছেলের জন্য অন্য জায়গায় যোগাযোগ করেছেন। নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন।
তবু মাঝে মাঝে বারান্দায় বসে ফোন হাতে নিলে তাঁর সেই বিকেলের কথা মনে পড়ে। ফোনটা তিনি করেছিলেন সাহায্য চাওয়ার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন, কিছু মানুষের কাছে আপনার প্রয়োজনের চেয়ে আপনার উপকারের স্মৃতিটাই বেশি অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
সেদিন বিকেলে ফোনটা আর এলো না। তারপর অনেক দিন কেটে গেছে।
রহিম সাহেবের ফোনে ছেলেটার নম্বরটি এখনো আছে। মুছে ফেলার কোনো বিশেষ কারণ তিনি খুঁজে পাননি। শুধু নম্বরটা দেখলে আর আগের মতো ফোন করতে ইচ্ছে করে না।
কিছু সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার শব্দ হয় না। শুধু একদিন দেখা যায়, যে মানুষটির জন্য একসময় দরজা খোলা থাকত, তার জন্য অপেক্ষা করাটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।