উৎখনন ও অন্বেষণ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পুরোনো একটা বাড়ি ভাঙার সময় মাটির নিচে একটা মাটির কলস পাওয়া গেল।
খুব সাধারণ কলস। গায়ে কোনো রাজচিহ্ন নেই, কারও নাম খোদাই করা নেই। দেখে বোঝারও উপায় নেই, কতদিন আগে কে এটাকে ব্যবহার করেছিল। অথচ হাতে তুলে নিলে অকারণে একটু থেমে যেতে হয়।
কার ছিল?
কোনো এক বাড়ির রান্নাঘরে কি রাখা থাকত?
সকালে কেউ পানি ভরত?
বৃষ্টির দিনে বারান্দার এক পাশে পড়ে থাকত?
তারপর বাড়িটা বদলেছে। মানুষ বদলেছে। কেউ মারা গেছে, কেউ অন্য শহরে চলে গেছে। একসময় বাড়িটাও আর থাকেনি। কলসটা কোনোভাবে মাটির নিচে চলে গেছে।
বাকি গল্পটা মাটি জানে।
পুরোনো জিনিসের প্রতি আমার আগ্রহটা বোধহয় এখানেই। জিনিসটার দাম কত, সেটা নয়; তার আগে কী ছিল, সেটা ভাবতে ভালো লাগে।
একটা কলসেরও তো একটা জীবন থাকতে পারে।
মানুষের জীবনের মতো খুব নাটকীয় নয়। বরং একেবারেই সাধারণ। প্রতিদিনের ব্যবহার, তারপর একদিন আর ব্যবহার না হওয়া। ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে চলে যাওয়া। শেষে মাটির নিচে।
অদ্ভুতভাবে আমাদের কিছু স্মৃতিও এমন।
সেগুলোকে আমরা মাটির নিচে পুঁতে রাখি না। শুধু জীবনের এত নিচে সরিয়ে রাখি যে নিজেরাই ভুলে যাই সেখানে কী আছে।
তারপর কোনো একদিন হঠাৎ সেটা উঠে আসে।
আমার এমন হয়েছে।
এক রাতে পুরোনো একটা গান শুনছিলাম। গানটা খুব পরিচিত। বহু বছর আগে নিয়মিত শুনতাম। তখন বিশেষ কিছু মনে হয়নি। কিন্তু সেদিন মাঝপথে এসে কেন যেন বাবার কথা মনে পড়ল। কোনো বড় ঘটনা নয়। বাবার সঙ্গে শেষ কথাও নয়। বরং তারও অনেক আগের একটা সাধারণ সন্ধ্যা—আমি বাইরে যাব বলে তৈরি হচ্ছি, বাবা ঘরের ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কখন ফিরবি?”
প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল।
আমি উত্তরও দিয়েছিলাম।
এত বছর পর সেই কথাটাই কেন মনে পড়ল, জানি না।
গান বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসেছিলাম।
সেদিন বুঝেছিলাম, স্মৃতি সবসময় বড় ঘটনার ভেতর থাকে না। অনেক সময় একটা সাধারণ বাক্য, একটা গন্ধ, একটা গান—কোথা থেকে যেন একটা পুরোনো দরজা খুলে দেয়।
আমরা নিজেদের বেশ ভালোই চিনি বলে মনে করি।
আসলে কি চিনি?
নিজের অতীতের দিকে একটু মন দিয়ে তাকালেই এই আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরে। যে সিদ্ধান্তটাকে এতদিন সঠিক বলে এসেছি, তার মধ্যে নিজের জেদটাও দেখা যায়। যে সম্পর্ক ভাঙার জন্য অন্য মানুষটাকে দায়ী করেছি, সেখানে নিজের নীরবতাটাও চোখে পড়ে। যে ব্যর্থতার কথা বলতে গিয়ে ভাগ্যের কথা বলেছি, সেখানে হয়তো আমার নিজের ভুল হিসাব ছিল।
এসব আবিষ্কার খুব আনন্দের নয়।
বরং বিরক্তিকর।
কারণ অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সময় গল্পটা সহজ থাকে। নিজের নামটা সেখানে ঢুকিয়ে দিলে হিসাব জটিল হয়ে যায়।
তখন প্রশ্ন আসে—আমি কি সত্যিই ঠিক ছিলাম?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মানুষ নিজের সম্পর্কে অনেক পুরোনো ধারণা হারায়।
হয়তো সেটাই উৎখননের আসল ঝুঁকি। মাটি সরাতে গিয়ে শুধু হারানো জিনিস পাওয়া যায় না; নিজের সম্পর্কে বানানো কিছু ধারণাও ভেঙে যায়।
তবু মাটি সরাতে হয়।
না হলে নিচে কী আছে, সেটা জানব কী করে?
কিন্তু শুধু খুঁড়তে থাকাও তো জীবন নয়।
অতীত আমাকে বলতে পারে কী ঘটেছিল। কোথায় ভুল হয়েছিল। কী হারিয়েছি। কিন্তু সে আমার হয়ে পরের দিনটা ঠিক করে দিতে পারবে না।
পরের সিদ্ধান্তটা আমাকে নিতে হবে।
এখানেই হয়তো ‘উৎখনন’ আর ‘অন্বেষণ’ পাশাপাশি দাঁড়ায়। একটি আমাকে পেছনের দিকে তাকাতে বাধ্য করে, অন্যটি পেছনে তাকিয়েও সামনে যাওয়ার কারণ খোঁজে।
সব হারানো জিনিস ফেরত পাওয়া যায় না। এটা মেনে নিতে আমারও সময় লেগেছে।
বাবাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। কোনো পুরোনো সন্ধ্যায় ফিরে গিয়ে অন্যভাবে কথা বলা যাবে না। বলা হয়ে যাওয়া কথাগুলোও মুখ থেকে তুলে নেওয়া যায় না। কিছু সম্পর্কের শেষ বদলানো যায় না, যত ইচ্ছে ব্যাখ্যা করলেও।
কিন্তু সেখানেই তো জীবন থেমে থাকে না।
কিছু একটা থেকে যায়।
একটা শিক্ষা হতে পারে। কোনো ভুলের স্মৃতি হতে পারে। নিজের সম্পর্কে একটু পরিষ্কার ধারণা হতে পারে। অথবা শুধু এই বোধ—পরেরবার একই জায়গায় দাঁড়ালে অন্যভাবে সিদ্ধান্ত নেব।
এটুকুই কি অন্বেষণ?
হয়তো।
বড় কোনো আবিষ্কার নয়। জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন খুব ছোট জায়গা থেকেই শুরু হয়। কাউকে ফোন করা, যাকে অনেকদিন ফোন করিনি। নিজের ভুলের কথা স্বীকার করা। কোনো পুরোনো অভ্যাস নিয়ে সত্যিই প্রশ্ন তোলা। কিংবা এক সন্ধ্যায় নিজের সঙ্গে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকা।
সব উত্তর তখনও পাওয়া যায় না।
কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
থাকুক।
আমার মনে হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরে এমন কিছু ঘর তৈরি হয়, যেগুলো সে নিজেই বহুদিন খোলে না। কোনো ঘরে রাগ, কোনো ঘরে আফসোস। কোথাও পুরোনো একটা স্বপ্ন। কোথাও এমন একজন মানুষ, যে একসময় ছিলাম আমি নিজেই।
সব দরজা খুলতে হবে না।
কখনো শুধু একটা দরজা একটু ফাঁক করলেই হয়।
ভেতরে তাকিয়ে যদি দেখি, এতদিন যেটাকে কেবল কষ্ট বলে ভেবেছিলাম, তার ভেতরেই একটা শিক্ষা পড়ে আছে?
যে ভুলটাকে শুধু আফসোস মনে হয়েছিল, সেটাই যদি পরের সিদ্ধান্তে আমাকে থামায়?
তাহলে পুরোনো জায়গায় ফিরে যাওয়াটা একেবারে বৃথা নয়।
সেই মাটির কলসটার কথাই আবার মনে পড়ে।
তার মালিককে আমরা কোনোদিন জানতে পারব না। কোন বাড়ির রান্নাঘরে ছিল, সেটাও নয়। কলসটা যে হাতগুলো ছুঁয়েছিল, সেগুলোও নেই।
তবু কলসটা উঠে এসেছে।
মাটি সরানোর পর সে আর আগের জায়গায় নেই।
আমাদের স্মৃতির ক্ষেত্রেও বোধহয় ব্যাপারটা এমন। অতীতকে বদলানো যায় না। কিন্তু তার নিচে চাপা পড়ে থাকা কথাগুলো একবার তুলে হাতে নিলে, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা বদলাতে পারে।
আমার কাছে উৎখনন সেখানেই।
আর অন্বেষণ হলো—কলসটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর, এবার কোথায় যাব, সেটা ঠিক করা।
হয়তো সব উত্তর জানা হবে না।
তবু মাঝে মাঝে মাটি সরাতে ইচ্ছে করে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।