স্বাধীনতার বোঝা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০৪ মার্চ ২০২৫
সকাল ৬টা ২০। অ্যালার্ম বাজে না—আসলে বাজে “চল, আবার শুরু কর দাসত্ব।” আমি হাত বাড়িয়ে ফোন নিই, যেন ভোরের প্রথম প্রার্থনা। স্ক্রিনে অফিসের মেইল: Urgent. জরুরি—কার জন্য? আমার জন্য নয়। কারও টার্গেট বাঁচানোর জন্য, কারও বসের সামনে “প্রোঅ্যাকটিভ” সাজানোর জন্য, কারও প্রেজেন্টেশনের স্লাইড চকচকে করার জন্য। আমার জীবনের সবচেয়ে জীবন্ত সময়টা আমি ইজারা দিয়েছি এমন এক প্রতিষ্ঠানের কাছে, যে প্রতিষ্ঠান আমার নাম নয়—আমার আউটপুট চেনে।
আমরা যাকে “ক্যারিয়ার” বলি, সেটা অনেক সময় স্রেফ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এক ধরনের বন্দিত্ব। শিকলটা লোহার নয়, ইএমআই-এর কাগজে; চাবুকটা হাতে নয়, performance review-এর টেবিলে। আর সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার কী জানেন? আমরা নিজেরাই এই শিকল নিয়ে গর্ব করি। “ব্যস্ত আছি” বলা এখন যেন মর্যাদার সার্টিফিকেট। ঘুম কম, চোখ লাল, মাথা ঝিমঝিম—তবু ছবি তুলে পোস্ট: Hustle. মানুষ লাইক দেয়, আর আমি ধীরে ধীরে বুঝি—এটা জীবন না, এটা প্রদর্শনী।
আমার চারপাশের মধ্যবিত্ত নীতিবোধটা খুব কৌতুককর। সবাই স্বাধীনতা চায়, তবে শর্ত আছে: স্বাধীনতা যেন নিরাপদ হয়, লোকজন যেন কিছু না বলে, পরিবার যেন বিরক্ত না হয়, বাজার যেন ধাক্কা না দেয়। অর্থাৎ স্বাধীনতা চাই—কিন্তু “ঝামেলা” ছাড়া। এটাকে স্বাধীনতা বলে না; এটাকে বলে সুবিধাবাদী সমঝোতা। আমরা আসলে স্বাধীনতার নাম করে আরেক ধরনের আরাম কিনি—যেটা টিকে থাকে অন্যকে খুশি রাখার বিনিময়ে।
পরিবার নিয়ে বলি—এখানেই কথাটা সবচেয়ে কাঁটা। আমাদের পরিবারগুলো ভালোবাসে, সন্দেহ নেই; কিন্তু ভালোবাসার সঙ্গে প্রায়ই থাকে এক ধরনের নরম ব্ল্যাকমেইল। “আমাদের জন্য এটা করো”—এই বাক্যটা শুনতে মধুর, কিন্তু অনেক সময় এর মানে দাঁড়ায়: “নিজের ইচ্ছাটাকে গিলে ফেলো।” বাবা চান ছেলে ডাক্তার হবে, মা চান ছেলে “ভালো জায়গায়” চাকরি করবে, আত্মীয়রা চান একটা বিয়ে “সময়মতো” হয়ে যাবে—কারও চাওয়াটা আলাদা আলাদা, কিন্তু মিল একটাই: তোমার জীবনটা যেন তাদের উদ্বেগ কমায়। আমি যদি বলি, “আমি এটা চাই না,” তখন শুরু হয় নৈতিকতার নাটক—কৃতঘ্ন, অমান্য, উচ্ছন্নে যাওয়া—এমন কত অভিধান বেরিয়ে আসে! আমরা যে দেশে বড় হই, সেখানে “নিজের মতো থাকা” প্রায় অপরাধের মতো শোনায়।
আর বিয়ে? আমরা একে প্রেমের গল্প বানাই, কিন্তু অনেক বিয়ে বাস্তবে সামাজিক চুক্তি—দুই পরিবারের ইমেজ মেরামতের প্রকল্প। সম্পর্কের ভেতরেও স্বাধীনতা নিয়ে লড়াই চলে। কেউ কাউকে ভালোবাসার নামে নিয়ন্ত্রণ করে, আর নিয়ন্ত্রণকে বলে “আমি তো তোমার ভালোর জন্য বলছি।” এই এক বাক্যে পৃথিবীর অর্ধেক কারাগার তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতা যদি সত্যি থাকে, তবে সেটা প্রশ্ন করার অধিকার, অসম্মতির অধিকার, একা থাকার অধিকার—এসবকেও জায়গা দেয়। নইলে সম্পর্ক আর অফিসের মধ্যে তফাৎ শুধু এতটুকু: অফিসে বেতন দেয়, সম্পর্কে দেয় অপরাধবোধ।
টাকা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় মিথ্যে হচ্ছে—“আর একটু হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।” আমরা ভাবি, আয় বাড়লেই মুক্তি। বাস্তবে আয় বাড়লেই খরচের স্ট্যান্ডার্ড বাড়ে, তারপর ঋণ, তারপর ভয়ের কিস্তি। “সম্মান” নামের একটা ভয়াবহ জিনিস আছে এই সমাজে—যেটা আসলে অন্যের চোখে নিজেকে বিক্রি করার দাম। নতুন ফোন না হলে মনে হয় আমি পিছিয়ে পড়েছি, বাইক না হলে আমি “স্ট্রাগলিং,” ফ্ল্যাট না হলে আমি “সেটেলড” না। এই শব্দগুলোই আমাদের শাসন করে: সেটেলড, স্ট্যাটাস, আপগ্রেড। আমরা নিজেরাই নিজেদের দাস বানাই, তারপর সেটাকে উন্নতি বলে উদযাপন করি।
আর ডিজিটাল দুনিয়া? এখানে আমরা স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় ভান করি। আমরা বলি, “আমার মতামত আছে”—আসলে আমাদের মতামত অনেক সময় অ্যালগরিদমের ধার করা। যে প্ল্যাটফর্মে আমি “নিজেকে প্রকাশ” করি, সে প্ল্যাটফর্মই ঠিক করে দেয় আমি কাকে দেখব, কী দেখে রাগ করব, কোন ইস্যুতে কাঁদব, কোন ট্রেন্ডে হাসব। আমি স্ক্রল করি, আর আমার মনকে কেউ অদৃশ্য হাতে চাষ করে—রাগ, ভয়, ঈর্ষা, কামনা—যা খুশি ফলায়। আমি ভাবি আমি যুক্ত, অথচ আমি সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন: নিজের কাছ থেকেই।
এখানে বিতর্কিত কথাটা বলি—আমরা নিজেরাই আমাদের শোষণের সবচেয়ে বড় দালাল। আমরা বসকে গালি দিই, কিন্তু “সিনিয়র” হওয়ার স্বপ্নও দেখি; আমরা কর্পোরেটকে ঘৃণা করি, কিন্তু তার ভাষায় কথা বলি; আমরা সমাজের ভণ্ডামি নিয়ে হাসি, কিন্তু সুযোগ পেলেই ভণ্ডামির সুবিধা নিই। আমরা স্বাধীনতা চাই না—আমরা চাই ক্ষমতা। আমরা চাই, শিকলটা যেন আমার হাতে থাকে, অন্যের হাতে না।
তাহলে মুক্তি কোথায়?
মুক্তি প্রথমে খুব অস্বস্তিকর। কারণ মুক্তি মানে আরেকজনকে খুশি না করার সাহস। মুক্তি মানে না বলা—বসকে, পরিবারকে, বন্ধুদের ট্রেন্ডকে, নিজের ভোগের অভ্যাসকে। মুক্তি মানে নিজের ভেতরের সেই ছোট্ট স্বৈরাচারকে চেনা—যে বলে, “লোকজন কী বলবে?” এই বাক্যটাই আমাদের জাতীয় শাসক।
আমি আজও পুরোপুরি মুক্ত নই। তবে আমি মিথ্যে কম বলার চেষ্টা করছি—নিজেকে, অন্যকে। আমি “ব্যস্ত” শব্দটা কম ব্যবহার করছি, কারণ অনেক ব্যস্ততা আসলে পলায়ন। আমি কিছু খরচ কাটছি, কারণ প্রতিটা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ভবিষ্যতের স্বাধীনতার ওপর কর। আমি ফোনকে টেবিলে উল্টো করে রাখি, কারণ আমার মন কোনো অ্যাপের মালিকানা নয়। আর সবচেয়ে কঠিন কাজটা করছি—পরিবারকে ভালোবাসি, কিন্তু নিজের জীবনও নিজেরটা বলে দাবি করছি। ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে সেটা আমার নিজস্বতাকেও সহ্য করতে পারবে।
স্বাধীনতা কোনো রোমান্টিক পোস্টার নয়। এটা এক ধরনের যুদ্ধ—বাইরের সঙ্গে কম, ভেতরের সঙ্গে বেশি। এবং এই যুদ্ধের সবচেয়ে বিতর্কিত সত্য হলো: আমাকে কেউ আটকায়নি—আমি নিজেই বহুদিন ধরে নিজের দরজায় তালা দিয়েছিলাম। এখন চাবিটা খুঁজছি। মাঝে মাঝে হাত কাঁপে, তবু তালা ঘোরাই—কারণ স্বাধীনতার বোঝা ভারী ঠিকই, কিন্তু পরাধীনতার চেয়ে
।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।