নীরবতার দায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
গল্পধর্মী প্রবন্ধ। ৯ জুন, ২০২৬
বিকেলের শেষ ফেরিটা তখন ঘাট ছাড়বে। হঠাৎ একটা মেয়ের কান্নার শব্দ কানে এলো। শব্দটা এমন ছিল যে না তাকিয়ে থাকা যায় না।
তাকিয়ে দেখি, নৌকার পাটাতনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পিঠে স্কুলব্যাগ। চুলে লাল ফিতা বাঁধা। কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছে, “আমি যাব না... আমি যাব না...”
আমি পাশে দাঁড়ানো একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় যাবে না?”
লোকটা যেন খুব সাধারণ একটা কথা বলছে, এমন ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “শ্বশুরবাড়ি।”
আমি আর কিছু বলিনি।
মেয়েটার কাঁধে তখনও স্কুলব্যাগ। অথচ সে স্কুলে যাচ্ছে না। এই দৃশ্যটা কেন জানি মাথা থেকে নামেনি।
আজও না।
কারণ আমি জানি, এই দেশে এমন মেয়ের সংখ্যা এক-দুইজন না। অনেক মেয়ের শৈশব শেষ হয় ঠিক এভাবেই। একদিন বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায়, আরেকদিন হঠাৎ সবাই ঠিক করে ফেলে তার বিয়ে হবে।
আমরা সাধারণত এসব ঘটনার পর আইনের কথা বলি। কিন্তু আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, শুধু আইন দিয়ে কি আসলেই এই সমস্যার শেষ হবে?
এই প্রশ্নটা মাথায় আসার একটা কারণ আছে।
আমার এক চাচাকে ছোটবেলা থেকে ধূমপান করতে দেখেছি। বাজারে, রাস্তার পাশে, চায়ের দোকানে—কোথায় না। কিন্তু একটা জিনিস কখনও দেখিনি। নিজের ছেলের সামনে তাকে সিগারেট ধরাতে।
কেউ তাকে নিষেধ করত না। পুলিশও না।
তবু করত না।
কারণ সে জানত, এটা সন্তানের জন্য খারাপ।
ব্যাপারটা আমাকে এখনও ভাবায়। অনেক সময় মানুষ আইনকে ফাঁকি দেয়, কিন্তু নিজের বিবেককে ফাঁকি দিতে পারে না। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রেও সমস্যাটা অনেকটা এমন।
কারণ বিয়ের সিদ্ধান্ত আদালতে বসে হয় না। হয় ঘরের ভেতরে। হয় আত্মীয়স্বজনের কথায়। হয় লোকলজ্জার ভয়ে।
অনেক বাবা-মা এখনও মনে করেন মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিতে পারলেই দায়িত্ব শেষ। কেউ ভাবেন এটাই নিরাপদ। কেউ ভাবেন, মেয়েকে বেশিদিন ঘরে রাখলে মানুষ কথা বলবে। সমস্যা হলো, এই বিশ্বাসগুলোকে আইন দিয়ে পুরোপুরি বদলানো যায় না।
কয়েক বছর আগে হলে হয়তো আমি কথাটা এত গভীরভাবে বুঝতাম না। কিন্তু আমার বড় বোন শেফালিকে দেখার পর বুঝেছি।
আপু পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। আমার চেয়ে ভালো। বই নিয়ে বসলে চারপাশের কিছুই যেন শুনত না। নতুন বইয়ের গন্ধ পেলে তার চোখ চকচক করত। তারও স্বপ্ন ছিল।
কিন্তু একসময় বিয়ের কথা উঠল।
আজও একটা দৃশ্য মনে আছে। বিয়ের আগের দিন।
আপু অনেক কেঁদেছিল। কেউ তাকে মারেনি। কেউ গালিও দেয়নি।
তবু সে কাঁদছিল।
কারণ তার কথা কেউ শুনছিল না।
রাতের দিকে আমাকে ডেকে বলেছিল,
“তুই পড়াশোনা ছাড়িস না।”
তখন কথাটার মানে বুঝিনি।
এখন বুঝি।
একটা মেয়ের কান্না সবসময় চোখের পানি না। অনেক সময় সেটা তার ভবিষ্যতের জন্য শেষ চেষ্টা।
আমাদের সমাজে সমস্যা এখানেই। আমরা প্রায়ই মেয়েদের জন্য সিদ্ধান্ত নিই, কিন্তু তাদের মতামত শুনি না। আমরা তাদের নিয়ে চিন্তা করি, কিন্তু তাদের কথা শুনে চিন্তা করি না।
ফারাকটা খুব ছোট মনে হয়।
আসলে ছোট না।
খুব বড়।
কারণ একটা মেয়ের জীবন বদলে যায় এই ফারাকের মাঝখানেই।
আইন আছে। থাকা দরকার। কিন্তু আইন একা কোনো সমাজ বদলায় না। সমাজ বদলায় তখন, যখন একজন বাবা মেয়ের ভয়টা বুঝতে শেখেন। যখন একজন মা মেয়ের স্বপ্নটাকে নিজের স্বপ্নের মতো গুরুত্ব দেন। যখন মানুষ অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো বন্ধ করে।
আমি জানি না ফেরিঘাটের সেই মেয়েটার কী হয়েছিল। ফেরিটা সেদিন ছেড়ে গিয়েছিল। মানুষজনও যার যার কাজে চলে গিয়েছিল।
কিন্তু মেয়েটার কান্নাটা রয়ে গেছে। কমপক্ষে আমার কাছে।
আর সেই কান্না আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়— বাল্যবিবাহ শুধু আইনের ব্যর্থতা না, আমাদের নীরবতারও।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।