ভালোবাসা, নাকি সুবিধা?
সম্পর্ক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২৫ অক্টোবর ২০২৬
একজন পুরুষ প্রতিদিন সকালে কাজে বের হন। মাথায় থাকে সংসারের খরচ, বাড়িভাড়া, বাজার আর মাসের শেষে কিছু টাকা জমিয়ে রাখার চিন্তা। অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তিনি আবার পরিবারের নানা সমস্যার সমাধান খোঁজেন। নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়েও থেমে যান, কারণ তিনি জানেন, তাঁর দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগ যেন নেই।
এত কিছুর পরও একদিন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, আমি মানুষটিকে ভালোবাসি, নাকি শুধু তার প্রয়োজন মেটানোর জন্যই আমার এত মূল্য?
প্রশ্নটা সহজ নয়। কারণ একটি সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা আর প্রয়োজন পাশাপাশি থাকে। মানুষ একে অন্যের ওপর নির্ভর করবে, বিপদে সাহায্য চাইবে, মানসিক ও আর্থিক সমর্থন পাবে—এটাই স্বাভাবিক। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন নির্ভরতা একতরফা হয়ে যায়। একজন শুধু দিয়ে যান, আর অন্যজন সেই দেওয়াকে নিজের প্রাপ্য বলে ধরে নেন।
ভালোবাসার নামে একজন মানুষকে সারাজীবন দায়িত্ব পালন করতে বলা যায়, কিন্তু তাঁর অনুভূতিগুলোকে অস্বীকার করা যায় না।
আমাদের সমাজে একজন পুরুষের সাফল্য মাপার কিছু পরিচিত মাপকাঠি আছে। তিনি কত টাকা উপার্জন করেন, পরিবারের জন্য কী কিনতে পারেন, বিপদে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেন—এসব দিয়ে তাঁকে বিচার করা হয়। সংসারের জন্য তাঁর পরিশ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, কিন্তু সেই পরিশ্রমের পেছনে থাকা মানুষটির ক্লান্তি কতটা গুরুত্ব পায়, সে প্রশ্ন খুব কমই ওঠে।
একজন পুরুষের হাতে টাকা থাকলে, তিনি সমস্যার সমাধান করতে পারলে অনেকেই তাঁর কাছে আসেন। কিন্তু কোনো কারণে তাঁর উপার্জন কমে গেলে, ব্যবসায় ক্ষতি হলে কিংবা অসুস্থতার কারণে আগের মতো দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সম্পর্কের আচরণও বদলে যেতে পারে।
তখনই বোঝা যায়, সম্পর্কের মধ্যে মানুষটিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল আর তাঁর সামর্থ্যকে কতটা।
অবশ্য সংসারের খরচ বহন করা, প্রিয় মানুষের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা কিংবা কঠিন সময়ে পাশে থাকা কোনো অন্যায় নয়। বরং এগুলো ভালোবাসারই প্রকাশ হতে পারে। একজন পুরুষ তাঁর সঙ্গীর জন্য নিরাপদ আশ্রয় হতে চাইবেন, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু আশ্রয় হওয়া আর নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দেওয়া এক কথা নয়।
অসম্মান সব সময় বড় কোনো ঘটনা দিয়ে শুরু হয় না। কখনো তা শুরু হয় ছোট্ট একটি কথায়, যেখানে একজনের পরিশ্রমকে তুচ্ছ করা হয়। কখনো তাঁর মতামতের কোনো মূল্য থাকে না, কখনো তাঁর ক্লান্তিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। তিনি নিজের জন্য একটু সময় চাইলে শুনতে হয়, সংসারের এত দায়িত্বের মধ্যে নিজের কথা ভাবার সময় হলো কীভাবে?
একসময় মানুষটি নিজের চাওয়াগুলো প্রকাশ করাই বন্ধ করে দেন। তিনি হয়তো সংসারের সব খরচ বহন করছেন, কিন্তু নিজের মনের কথা বলার মতো জায়গা পাচ্ছেন না। তাঁর পাশে একজন মানুষ আছেন, অথচ নিজের একাকিত্বের কথা বলার জন্যও তাঁকে অন্য কাউকে খুঁজতে হয়।
বাইরে থেকে সম্পর্কটি স্বাভাবিক দেখাতে পারে। একই ছাদের নিচে থাকা, একসঙ্গে খাওয়া, পরিবারের অনুষ্ঠানে পাশাপাশি দাঁড়ানো—সবই চলছে। শুধু দুজনের মধ্যে সেই আন্তরিকতা আর নেই, যেখানে একজন অন্যজনের কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করেন।
তবে বিষয়টি নারী বা পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার নয়। সম্পর্কের মধ্যে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা উভয়ের মধ্যেই থাকতে পারে। একজন নারী যদি মনে করেন, তাঁর সঙ্গী উপার্জন করবেন, সব সমস্যার সমাধান করবেন, সব অসম্মান সহ্য করবেন, অথচ তাঁকে সম্মান দেখানোর প্রয়োজন নেই, তাহলে সেখানে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। একইভাবে কোনো পুরুষ যদি স্ত্রীর ভালোবাসা, শ্রম ও ত্যাগকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে তাঁর অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেন, সেখানেও ভালোবাসার ঘাটতি তৈরি হয়।
সংসারে অবদান রাখার ধরনও সবার এক নয়। একজন হয়তো অর্থ উপার্জন করেন, অন্যজন সন্তান লালন-পালন ও ঘরের দায়িত্ব সামলান। কারও অবদান টাকায় মাপা যায়, কারওটা যায় না। তাই সম্পর্কের মূল্য নির্ধারণে শুধু আয় কিংবা কে কতটা খরচ করেন, সেটিকে একমাত্র মাপকাঠি বানানো যায় না।
প্রশ্ন হলো, দুজন কি একে অন্যকে মানুষ হিসেবে দেখছেন, নাকি নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন?
ভালোবাসা কোনো হিসাবের খাতা নয়, যেখানে প্রতিটি কাজের বিপরীতে সমান মূল্য ফেরত দিতে হবে। অসুস্থতার সময় একজন বেশি যত্ন নেবেন, বিপদের দিনে একজন অন্যজনের চেয়ে বেশি ত্যাগ করবেন—এটাই সম্পর্কের সৌন্দর্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যদি একজনই সব দায়িত্ব পালন করেন আর অন্যজন শুধু সুবিধা গ্রহণ করেন, তখন সেই সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা অন্যায় নয়।
নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করাও জরুরি। কাউকে ভালোবাসেন বলে প্রতিটি অসম্মান চুপচাপ সহ্য করতে হবে না, নিজের বিশ্রাম কিংবা আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হবে না। প্রয়োজনে 'না' বলা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা নয়; কখনো কখনো এটি নিজের মর্যাদা রক্ষা করার উপায়।
একই সঙ্গে সঙ্গীর কাছ থেকে শান্তি, বিশ্বস্ততা ও সম্মান আশা করার অর্থ এই নয় যে তিনি কখনো ভুল করবেন না কিংবা সব সময় আপনার সঙ্গে একমত হবেন। সুস্থ সম্পর্কে মতবিরোধ থাকে, অভিমান হয়, ভুল বোঝাবুঝিও ঘটে। পার্থক্য হলো, সেখানে কেউ কাউকে ছোট করে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চান না। ভুল হলে কথা বলা যায়, কষ্ট পেলে তা জানানো যায়, আর সমস্যা তৈরি হলে দুজন মিলে সমাধানের চেষ্টা করা যায়।
একজন পুরুষের মূল্য শুধু তাঁর উপার্জনে নয়। তিনি কত বড় বাড়ি কিনেছেন, কত দামি উপহার দিয়েছেন কিংবা কত সমস্যা একা সামলেছেন, সেসবের বাইরেও তাঁর পরিচয় আছে। তাঁরও মন খারাপ হয়, তাঁরও বিশ্রাম দরকার হয়, তাঁরও এমন একজন মানুষ প্রয়োজন হয়, যার কাছে সব সময় শক্ত থাকার অভিনয় করতে হবে না।
একইভাবে একজন নারীর মূল্যও শুধু তাঁর ত্যাগ কিংবা সংসার সামলানোর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। দুজনেরই নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে। ভালোবাসা তখনই গভীর হয়, যখন কেউ কাউকে কেবল নিজের সুবিধার উৎস হিসেবে দেখেন না।
সম্পর্কের প্রকৃত চেহারা বোঝা যায় প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে। আপনি ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে কেউ আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চান কি না, দিনটা কেমন গেল। আপনার কোনো সমস্যা হলে তিনি শুধু সমাধান চান, নাকি সমস্যার ভেতরে থাকা মানুষটিকেও বোঝার চেষ্টা করেন। আপনার সামর্থ্য কমে গেলে তিনি পাশে থাকেন, নাকি আপনার প্রতি তাঁর আগ্রহও কমে যায়।
জীবনসঙ্গী হওয়া মানে কারও সব দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়। বরং এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে দুজনই জানেন—প্রয়োজনে একজন অন্যজনের ভার বহন করবেন, কিন্তু কাউকেই চিরকাল একা সব ভার বহন করতে হবে না।
ভালোবাসা বোঝা যায় তখন, যখন দেওয়ার মতো কিছু থাকে না, তবুও কেউ পাশে থেকে যায়। কারণ যে সম্পর্ক শুধু সামর্থ্যের সময় আপনাকে মূল্য দেয়, সেখানে আপনার উপার্জন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু আপনার অস্তিত্বের মূল্য তখনও স্বীকৃতি পায় না। সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে শুধু প্রয়োজনের সময় কাছে টানে না; প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও তাকে আপন করে রাখে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।